Translate

ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটদের গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩১ মে, ২০১৮

অনেক কিছু পাওয়া







("একপর্ণিকা" ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রকাশিত)



তোয়ার ঘুম ভেঙেছে একটু আগে। বাবা মাঝে মাঝে বলেন, ‘আর্লি টু বেড আর আর্লি টু রাইজ, মেক্স আ ম্যান হেলদি এণ্ড ওয়াইজ।’ ক্লাস টুতে পড়া তোয়া ইংরিজি ওই শব্দগুলোর মানে জানে, আর তার ঠাম্মি এ ছড়াটার যে বাংলা করেছে, সেটা আরো বেশী মজার!
‘তাড়াতাড়ি করলে ঘুমু, ঠাম্মা দেবে অনেক চুমু উঠে পড়ো থাকতে ভোর, জ্ঞানের সাথে বাড়ে জোর’

অন্যদিনের মতো আজও খুব সক্কালে ঘুম ভেঙে উঠে তোয়া দেখল মা-বাবা ঘুমোচ্ছেন অন্যদিন ওঁরাও উঠে পড়েন, কিন্তু আজ রবিবার কিনা তাই একটু বেলা করবেন উঠতে  তোয়া ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসতেই, খোলা জানালা দিয়ে তার বন্ধুরা ডাকাডাকি শুরু করে দিল। বুলবুলি বলল,
‘তোয়াদিদি, তোয়াদিদি, আজ কিন্তু তোকে, আমি প্রথম ডেকেছি, নতুন আলোর ঝোঁকে’ শালিক যেমন খুব মজা করে, তেমন ঝগড়াও করে, সে বলল,
‘বলতো দেখি তোয়, তোর কী মনে হোয়, কে বেশী হিংসুটি? আমি? না বুলবুল কেলে ঝুঁটি’?
তোয়া মুখে হাত চাপা দিয়ে নি:শব্দে দুলেদুলে হাসল কিছুক্ষণ, তারপর ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে ইশারায় বলল,
‘অ্যাই, অ্যাই, চুপ চুপ, করিস না রে ঝগড়া? মা বাবার ভাঙলে ঘুম সব কিছুতেই ব্যাগড়া’!
খুব আআস্তে আআস্তে বিছানা থেকে নেমে, তোয়া মেঝেয় যেমনি পা দিল, মা আধখানা চোখ মেলে আলসে গলায় বললেন,
‘ছাদে যাচ্ছো যাও, কিন্তু আলসে দিয়ে ঝুঁকবে না’। তোয়া সবসময় দেখেছে ঠাম্মি, দাদুন, বাবাকে ফাঁকি দেওয়া যায়, কিন্তু মাকে – অসম্ভব! মাদুগ্গার মতো তিনচোখ না থাকলেও, মা সব দেখতে পান, সব বুঝতে পারেন। মেঝেয় নেমে মায়ের গালে হামি খেয়ে, তোয়া হাল্কা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে, বারান্দা পেরিয়ে দৌড়ে উঠতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে।

সক্কাল সক্কাল ছাদে উঠতে তোয়ার খুব মজা লাগে। আকাশ জুড়ে নরম নরম আলো। ঝিরঝিরে হাওয়া। চারিদিকের গাছপালার পাতায় পাতায় চলছে রান্নাবান্নার তোড়জোড়। হাতাখুন্তি, বাসনকোসন নাড়াচাড়ার শব্দ শোনার জন্যে সে কান পাতে, কিন্তু শুনতে পায় না। তোয়ার কাকু বলেন,
‘তোর মা, ঠাম্মি রান্নাঘরে, আমাদের জন্যে যখন খাবার বানান, কত রকমের শব্দ হয় শুনিসনি? ঠুনঠান, ঘটরঘটর, ছ্যাঁকতেলতেল ছোঁককলকল’? তোয়া ঘাড় নেড়ে সায় দেয়, শুনেছে তো, সে সময় কী সুন্দর রান্নার গন্ধও বেরোয়, সেই গন্ধে তো তোয়ার লোভ লাগে, খিদে খিদে পায়!
‘একদম সেইরকম, রোদ্দুরের আলোর আগুনে, গাছের পাতার রান্নাঘরে গাছ তার নিজের জন্যে এবং আমাদের জন্যেও খাবার বানায়।’
‘আমাদের জন্যেও?’ অবাক হয়ে বড়োবড়ো চোখে তাকিয়েছিল তোয়া। ‘কই কোনদিন দেখিনি তো?’
কাকু আদর করে তোয়ার রেশমী কোমল চুল এলোমেলো করে দিয়ে হেসে বললেন,
‘ওরা কী আর ভাতডালতরকারি বানায়? ওরা বানায় চাল, গম, ডাল, সব আনাজ, সব রকম ফল - আম, জাম, লিচু, পেয়ারা।’ একটু থেমে কাকু বলেছিলেন, ‘আরো কী জানিস, তোয়ারাণি, আমাদের রান্নায় যেমন সুন্দর গন্ধ হয়, তেমনি মাঝে মাঝে বেশ ঝাঁঝালো গ্যাসও হয়। সে ঝাঁজে নাক জ্বলে, চোখ জ্বলে, হ্যাঁচ্চো হয়। গাছেদের রান্নায় তেমন কোনদিন হয় না।’
‘তাই?’
‘হুঁ। বরং সেই গ্যাসে আমাদের শ্বাস নিতে আরাম হয়, আর সেই গ্যাস বাতাসে যতো বেশি থাকে,  আমাদের শরীরও ততো চাঙ্গা থাকেশহর থেকে দূরে, যেখানে অনেক গাছপালা, সেখানে তাই জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়। এখন তো তুই ছোট্ট, বড়ো হলে জানবি ওই গ্যাসের নাম অক্সিজেন, আর গাছেদের এই রান্নার নাম সালোকসংশ্লেষ।’
কাকু প্রায়ই বাইরে চলে যায়, দুতিন মাস পরপর বাড়ি এসে, দিন দশেক থাকে। তখন তোয়ার জন্যে কিছুমিছু জিনিষ আনেই, আর আনে অনেক অনেক মজার মজার কথা। কাকু ছাড়া তোয়া তখন আর কাউকে চিনতেই পারে না।
সকালবেলা ছাদে উঠলেই তোয়ার কাকুর কথা মনে পড়ে খুব। কাকুর কথা মতো বুক ভরে খুব জোরে জোরে শ্বাস নেয়। আজ তার এই শ্বাস নেওয়া দেখে চড়ুই মিচকি মিচকি হাসল, বলল,
‘ও তোয়াদি, ও তোয়াদি, আর নিও না যেন, বাতাস থেকে ফুরিয়ে যাবে পুরো অক্সিজেন
চড়ুইয়ের এই কথায়, তোয়া এবং অন্য সবাই হেসে ফেলল কিচিরমিচির করে, শুধু কাক গম্ভীর হয়ে বলল,
‘গুডমর্নিং তোয়াদিদি, তোমার আদরে না চড়ুই‍টা খুব ফাজিল হয়েছে, তোমাকেই আর মান্যি করেনা।’
হাসতে হাসতে তোয়া বলল,
‘বারে, আমি বুঝি স্কুলের বড়োদিদিমণি? ভয় পেয়ে বলবে আমায়, “আজ্ঞে দিদি, আপনি?”’ তোয়ার কথায় কাক একটু দমে গেল, কিন্তু অন্যেরা বেশ মজা পেল। তোয়া কাককে আবার বলল,
‘মিষ্টি সুরে বলতে কথা, বলছি কতো বল, তুই শুধুই খুঁজিস দেখি ফাঁকি দেওয়ার ছল।’
কাকটা আরো অপ্রস্তুত হয়ে, একবার ঠোঁট আর একবার ঘাড় চুলকোল, তারপর বলল,
‘কা কা করি, খা খা করি, তার তো থাকে মানে, কাক ডেকেছে মিষ্টিসুরে, এমন কী কেউ জানে?’
কাকের এই কথা শুনে তোয়া হাততালি দিয়ে হাসতে লাগল খুব। আর অন্য পাখিরাও ডানা ঝাপটে ঝটপট বলে উঠল,
‘কাকদাদা গো কাকদাদা, তুমিই হলে সেরা, তোমার কথার সুরটি যেন মিষ্টি মধু ঘেরা’ কথাগুলো বলে ফেলে কাক একটু লজ্জা পাচ্ছিল, কি জানি কী বলে ফেললাম! এখন সকলের প্রশংসায় একটু গম্ভীর হয়ে বলল,
‘তোয়াদিদির ক্লাশে পড়ে শিখছি কত কী যে, কাকের গলায় মিঠে সুর শুনছি এখন নিজে’! তোয়া হাসতে হাসতে বলল,
‘তোদের মতো মিষ্টি ডানা থাকতো যদি মোর, ফুড়ুৎ করে উড়ে যেতাম একটু হলেই ভোর। এদিক সেদিক ঘুরে এসে খেতাম মায়ের বকুনি, বইয়ে ভরা ব্যাগটি পিঠে স্কুল ছুটতাম তখুনি। যা কিছু সব বইয়ে পড়ি দিদিমণির কাছে, উড়ে উড়ে দেখে নিতাম কোনটা কোথায় আছে? সেই কবে তুই খেয়েছিলি কাদের ক্ষেতের ধান, বুলবুলি তোর ঘুঁচলো না দেখ আজও সে বদনাম। কে যেন সে কত আগে দেয়নি বুঝি খাজনা, তোর কথাতেই মানুষগুলো আজও বাজায় বাজনা’। বুলবুলি খুব দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল,
‘ওসব কথায় দিই না গো কান, তোয়াদিদি বুঝলে, বুলবুলিঝাঁক পাবে না আর ধানের ক্ষেতে খুঁজলে। এখনও তাও উড়ে বেড়াই, দুচারটে বুলবুল, কবে কখন হারিয়ে যাবো, আর পাবেই না বিলকুল।’ তোয়াদিদি বড়ো বড়ো চোখে তাকিয়ে বলল,
‘সত্যি, এমন যদি হয়, মনে ভীষণ লাগে ভয়। আমরা আছি, গাছও আছে, নেই শুধু হায় পাখি, আমাদেরও জীবন দেখিস রইবে আধেক বাকি। সকালবেলার ঘুমটি ভাঙে তোদের ডাকটি শুনে, দুপুর বেলা ঘুম এসে যায় ঘুঘুর সুরের গুণে নিরিবিলি একলা বনেও, সঙ্গী থাকিস তোরা। তোদের পিছু ঘুরে ঘুরে সময় কাটাই মোরা’। তোয়াদিদির এই কথায় টিয়া বলল,
‘তুমি ছাড়া তেমন কেউ দেখেই না গো মোদের ব্যাটারি দেওয়া খেলনা পাখি আছে দেখি ওদের! সে পাখিরা দেখতে যেন, আমরা অবিকল। ঘন ঘন ডিগবাজি খায়, বাপরে কী ধকল! তাদের মধ্যে কেউ কেউ শুনি সুরে বলে ছড়া; হামটিডামটি, জ্যাকএন্ডজিল যেমন তোমার পড়া’। তোয়াদিদি খুব তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল,
‘ধুর ধুর। ওসব দেখে মজা পায় পুঁচকি ছেলেমেয়ে। একটুখানি বড় হলেই, কেউ দেখেও না আর চেয়ে। কলের পুতুল হাতে নিয়ে, কদিন চমক লাগে ঠিকই। কিন্তু রোজই আমি অবাক হই, যত্তো তোদের দেখি’।
‘সে তো তুমি, আমাদের ভালোবাসো বড়োই, রোজই তুমি আমাদের আদর যত্ন করোই। গরমকালে কোথাও যখন, পাই না খাবার জল। আমরা বলি, সবাই মিলে তোয়ার বাড়ি চল। তোমার গামলা ভরা জলে, আমরা আসি দলে দলে। তোমার ওই জলেই আমরা সবাই মেটাই তৃষ্ণা। কিন্তু ওই কাক, যতো বলি, অমন করিস না! শুনবে না, নেয়ে খেয়ে জলটাকে করে তুলবেই ঘোলা’তোয়াদিদি হাসতে হাসতে বলল,
‘কাকের তো নেই কান, থাকলে দিতাম কানমোলা’ কাক ঠোঁট আর ঘাড় চুলকে, একটু মিচকে হাসল, বলল,
‘গরমকালে নোংরা খেয়ে, আনচান করে গা। তোমার রাখা জল দেখে তাই থাকতে পারি না। গামলার জলে কাকচান সেরে বড্ড আরাম পাই, তোয়াদিদি গো, আমার পরে রাগ করতে নাই’। কাকের কথায় তোয়া দুলে দুলে খুব হাসতে লাগল, অন্য পাখিরাও কিচিরমিচিরে ভরে তুলল চারদিক। তোয়া বলল,
‘রাগ করিনি মোটেই আমি, দুষ্টুসোনা কাক, আজ থেকে নয় তোর জন্যে এক উপায় করা যাক। আরেকখান গামলা এনে রাখবো ভরে জল, তখন যেন করিস না আর নতুন কোন ছল’।
চড়াই, শালিক, পায়রা, বুলবুলি, টিয়া সবাই এই ব্যবস্থায় খুব খুশি হল, বলল,
‘তোয়াদিদি, বেশ হবে, মজা হবে, এমন যদি হয়, তেষ্টা পেয়ে কষ্ট তবে হবার কথা নয়’।

কাকের সর্বদাই খিদে পায়। সে যেমন কা কা করে, তেমনি খা খা করে। ভোর থেকে উঠে নোংরা ঘেঁটে, আবর্জনা ঘেঁটে খেয়েছে কিছু মন্দ না, কিন্তু তাও তার আর তর সইছিল না, খিদেয় উড়ুউড়ু করছিল। ঠোঁট ফাঁক করে, দুবার খা খা ডেকে বলল,
‘তোয়াদিদি, তোয়াদিদি এবার আমি উড়বো, কোনখানে কী খাবার পাই সন্ধানে তার ঘুরবো’।
তোয়াদিদি কাকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল, তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল, 
‘আচ্ছা, আচ্ছা, দুষ্টুসোনা কাক, এখন উড়েই তবে যাক। আমারও নিচের থেকে পড়বে এবার ডাক। আমাদের গল্পগাছা এই অব্দিই থাক। বিকেলবেলা আসিস সবাই একটু পেলে ফাঁক’। টিয়া বলল,
‘ঠিক বলেছ, তোয়াদিদি, সময় হল যাবার, বাসায় আছে বাচ্চা দুটো তাদের জন্যে খাবার, যোগাড় করে নিয়ে যাবো ঘুরে বাদাড়বন, বিকেলে বেলা ফেরার পথে কথা বলব অনেকক্ষণ’। কাক উড়ে গেল বাজারের দিকে, যেখানে অনেক নোংরা আর আবর্জনা জমা হয়, আর টিয়া উড়ে গেল সামনের বিরাট বাগানের দিকে।
ওদের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে অন্য পাখিরা বলল,
‘তোয়াদিদি তুমিও এবার নিচেয় চলে যাও, মুখটুক ধুয়ে, চটপট করে খাবার খেয়ে নাও। তারপরে তো বসবে খুলে এত্তো এত্তো বই! দুপুর অব্দি তুমি আর সময় পাবে কই? আমরা যে কজন থাকি তোমার আশেপাশে। পড়ার ঘরের জানালায় বসি ঘুরে ঘুরে এসে তোমার দিকে চোখ রেখে কষ্ট যে পাই খুব, লেখায় পড়ায়, নাচে গানে, তোমার ছটা দিনই ডুব’
চড়াই, শালিক, পায়রা বুলবুলি সবাই উড়ে গেল হুশ করে। ওদের উড়ে যাওয়া ডানার দিকে তাকিয়ে তোয়া একটু হাসল, তারপর নিজের মনেই বলল,
‘রবিবারেই মেলে আমার বেশ কিছুটা ছুটি, তোদের কথা শুনতে তাই ভোরবেলাতেই উঠি। তোদের ডানায় পাই রে আমি মুক্ত আকাশ নীল। নিবিড় সবুজ গাছে ঘেরা শান্ত গভীর ঝিল। বদ্ধ মনে ভাসিয়ে আনিস সতেজ মুক্ত হাওয়া। ওইটুকুতেই পাখির ঝাঁক, আমার অনেক কিছু পাওয়া’!


-০০-

বুধবার, ৩০ মে, ২০১৮

চিংড়ি লো চিংড়ি



("কিশোর বার্তা" পত্রিকায় প্রকাশিত) 



(কোলের কাছে বসে, চিংড়ি ভাজা দিয়ে ডালভাত মাখা খেতে খেতে,
দিদিমার মুখে ছোট্টবেলায় যেমনটি শুনেছিলাম, এটা সেই গল্প – একটু আলাদা মোড়কে।)

ভোরের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ, পুব আকাশে এখন মায়ের কপালে সিঁদুরের টিপের চেয়েও এত্তোবড়ো সূর্য। তার রোদ্দুর একটু তেরছা হয়ে পড়ছে জামরুল গাছের পাতায় পাতায়। পাতা ভিজিয়ে রোদ্দুর গড়িয়ে পড়ছে টুপ টাপ, পুকুরের জলে। চারদিকে গাছে ঘেরা এঁদো পুকুর। সবুজ জল, খুদিপানায় ভর্তি। ঘাটের কাছে, মেয়ে বউরা বাসনকোসন মাজতে বসে, সেখানে জলটা একটু পরিষ্কার। উল্টোদিকের পাড়ে যেখানে খুব গাছপালা আর আগাছার ঝাড়, সেখানে পাতার আড়ালে বসে থাকে মাছরাঙা পাখি। আনমনে ছোট মাছেরা একটু ওপরের দিকে ভেসে উঠেছে কি, ঝপাং - মাছরাঙার ঠোঁটে রূপোর ঝিলিক।
এদিকে মাঝ পুকুর বরাবর কিছু শালুকের ডগা জেগে আছে সাদা পাপড়ি মেলে। আশেপাশে গোলগাল আসনের মতো ভাসছে সবুজ পাতাখুব হাল্কা হলে, জল থেকে উঠে বসাও যায় ওই পাতায়। যেমন আজ সকালে এসে এইমাত্র বসল, চিংড়িরাণিসারাক্ষণ জলের মধ্যে থেকে তার চুল শুকোয় না। আজ শালুকপাতায় বসে রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে সে বসল চুল শুকোতে।
একটু আরাম করার কি জো আছে? হতচ্ছাড়া এক কাক, কোথায় ছিল, উড়ে এসে বসল, কাছের তেঁতুল গাছের ডালে। দুবার ডাকল, খা খা। সর্বদাই তার খাবার চিন্তা। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক দেখল, ওদিক দেখল। তারপর তার চোখ পড়ল ছোট্ট চিংড়িরাণির ওপর। লোভে তার ঠোটঁ ফাঁক হয়ে গেল, বলল,
‘চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে’!  
কাকের গলা পেয়ে, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল চিংড়িরাণিরাক্ষুসে কাকের ফাঁক করা ঠোঁট দেখে চিংড়িরাণির ভয়ও লাগল খুব, আবার রাগে হাত-পাও জ্বলতে লাগল। শালুক পাতার কানা থেকে তিড়িং করে লাফ মারল জলে। জলের মধ্যে ডুবে বেশ নিশ্চিন্তি। ভয়টা তো কাটল, কিন্তু রাগ? সেটা তো কমছে না! আকাশের কাকের সঙ্গে জলের চিংড়ির কী সম্পর্ক? চিংড়ি বুঝি ফ্যালনা, তাকে ‘তুই’ বলা যায়, ‘লো’ বলা যায়, আবার টপ করে খেয়েও ফেলা যায়? রাগে সমস্ত শরীর রি রি করতে লাগল চিংড়ির। কী করা যায়, কী করা যায়, ভাবতে ভাবতে চিংড়িরাণি গেল তার কাতলা দাদার কাছে।
কাতলাদাদা আর বৌদি তখন খুব ব্যস্ত। কাতলাদাদা আপিস যাবে, বাচ্চারা যাবে স্কুলবৌদি কাতলাদাদাকে খেতে দিয়েছে, বাচ্চারাও সবাই খেতে বসে হই হট্টগোল করছে। কাতলাদাদা চিংড়িরাণিকে দেখেই বৌকে বলল,
‘কে এয়েচে দেখো। আয় রে বোন চিংড়িরাণি, ওকে শিগ্‌গির দাও পিঁড়ি-পানি’।  বৌদি বলল,
‘ও মা ঠাকুজ্জি, এসো বোনটি, বোস বোনটি, এই নাও পানি, আর পিঁড়ি দিচ্ছি আনি’কাতলা চিংড়িরাণির মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,  
‘কিন্তু বোন, বল তো দেখি কেন? তোর মুখটা ভীষণ ভার, মনে হচ্ছে যেন’
কাতলাদাদার কথায় ফুঁপিয়ে উঠে চিংড়িরাণি বলল,
‘সকাল বেলায় চানটি করে কীই বা করি বল, শালুকপাতায় বসে তখন শুকোচ্ছি কুন্তল। কাকটা এল উড়ে, বসল একটু দূরে। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”! বললে আমায় কাক, আমায় খাবার ঝোঁকে। কাক আমাকে খেত, সেও ভালো হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? এই অপমান থাকতে তোরা, সইতে হবে হেন’?
চিংড়িরাণির এই কথায় রেগে আগুন হয়ে উঠল কাতলাদাদা আর বৌদি। বলল,
‘হতচ্ছাড়া কাকের এতোই আস্পর্দা, কাতলা যে তোর বড়দা, গেছেই বোধ হয় ভুলে। কানটি তাহার মুলে, পাঠিয়ে দেবো খড়দা। এক কাজ কর তুই বোন, খারাপ করিস নে আর মন। এখন আমার ঘরেই থাক, তোর বৌদি আছে যখন। আপিস থেকে আসছি আমি ফিরে, দেখব আমি তখন। কি ভাবে ঢিট হতে পারে কাক বাছাধন’
কাতলাদাদার এই কথায় চিংড়িরাণি ভরসা করতে পারল না। রেগেও গেল খুব। আমি জ্বলছি কাকের কথায়, কাতলাদাদা চলল নেকটাই ঝুলিয়ে আপিস করতে! আপিস থেকে ফিরতে হবে সন্ধে। ততক্ষণ কাক বুঝি বসে থাকবে, কাতলাদাদার কাছে জব্দ হওয়ার জন্যে! প্রচণ্ড রাগে চিংড়িরাণি থড়বড়িয়ে বেরিয়ে গেল কাতলাদাদার ঘর থেকে, কাতলাদাদা বলল,
‘কোতা যাস, কোতা যাস, ও আমার বোন’বৌদি বলল,
‘ঠাকুজ্জি, ঠাকুজ্জি, একবারটি শোন’

কে শোনে কার কতা? চিংড়িরাণি একদণ্ডও আর দাঁড়াল না। সোওওজা গেল শোলদাদার বাড়ি। শোলদাদার বাড়িতে তখন খুব হট্টগোল। শোলদাদা নিজেই বাজায় ঢ্যাম গুড়গুড় ঢোল। বাদ্যি থামিয়ে শোলদাদা বলল,
‘আয় আয় বোন চিংড়ি, মুখটা কেন হাঁড়ি? সকাল সকাল কি হল রে, জানতে আমি পারি?’
চিংড়ি খুব রাগে গনগনে মুখে বলল,
‘শালুকপাতায় বসে আমি শুকোচ্ছিলাম চুল, সকাল সকাল সেইটা বুঝি, হল আমার ভুল? হতচ্ছাড়া কাক, করছিল হাঁকডাক। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”! বললে আমায় জেন। খেত তো ভালোই হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? এই কথাতেই হলাম আমি ভীষণ অপমান। বিহিত কিছু না করলে, দেবই আমি প্রাণ’
এই কথা শুনে শোলদাদাও খুব রেগে গেল। নিজের লেজ ঝটপট করে বলল,
‘রাগ হচ্ছে খুব। কাক ব্যাটাকে সঙ্গে নিয়ে জলেই দেব ডুব। ইচ্ছে হলেও, সত্যি সত্যি করতে কি আর পারি? চল তো দেখি, আমার সঙ্গে কাঁকড়াকাকার বাড়ি। সেথায় গেলে বেরিয়ে যাবে, একটা কোন উপায় কী করেই বা কাকব্যাটা, এমন বলতে সাহস পায়?’

শোলদাদার সঙ্গে চিংড়িরাণি চলল, কাঁকড়াকাকার বাড়ি। কাঁকড়াকাকা, সকালে উঠে ব্যায়াম করছিল, ইয়া মোটামোটা দাঁড়া ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে। হন্তদন্ত হয়ে ওদের আসতে দেখে কাঁকড়াকাকা ব্যায়াম থামিয়ে বলল,
‘আয়রে আমার চিংড়ি, আয়রে আমার শোল। কিছু একটা নিশ্চয়ই হয়েছে গণ্ডগোল। সকাল সকাল নইলে কেন আসবি তোরা বাড়ি? মুখটি দেখে মনে হচ্ছে, রেগে আছিস ভারি?’
কাঁকড়াকাকার চেহারা দেখে চিংড়িরাণি অনেকটাই ভরসা পেল। সে হাঁফাতে হাঁফাতে বলল,
‘সকালবেলায় রোদ্দুরটি উঠেছিল বেশ, শালুকপাতায় বসে আমি শুকোচ্ছিলাম কেশ। হঠাৎ এল কাক, ঠোঁটটি করে ফাঁক। “চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে”, বললে আমায় কাক, লোভ চকচক চোকে’খেত তো ভালোই হত, কিন্তু ‘লো’ বলবে কেন? কেউ কোত্থাও নেই আমার, কোন স্বজন যেন?’
কাঁকড়াকাকা এই কথা শুনে ভীষণ রেগে গেল। মোটামোটা দুই দাঁড়াতে শান দিয়ে বলল,
‘দাঁড়া, চিংড়ি, দাঁড়া। দেখছিস এই দাঁড়া? চেপে এমন ধরব আমি কাকব্যাটার গলা, বন্ধ হয়ে যাবে তার সকল কথা বলা। কাকব্যাটাকে কেমন করে করবো আমি বন্দী। সেটাই আসল ফন্দি। গায়ে আমার বাঁধতো দেখি, আচ্ছা সে ব্যাণ্ডেজ। মনে হবে আঘাত পেয়ে, আমার ঝিমিয়ে গেছে তেজ’

কাঁকড়াকাকার কথা মতো শোল আর চিংড়ি, কাঁকাড়াকাকার গায়ে খুব চওড়া করে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে দিল, শুধু দাঁড়াদুটো খোলা রইলব্যাণ্ডেজ বাঁধা হয়ে যাওয়ার পর তিনজনে গেল সেই শালুক পাতার কাছে। কাঁকড়াকাকা জল থেকে ভেসে উঠে, শালুকপাতার ওপর চড়ে শুয়ে পড়ল চিৎপাত হয়ে। চিংড়ি আর শোল জলের মধ্যেই ভাসতে থাকল কি হয় দেখার জন্যে। কাঁকড়াকাকাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সত্যিই যেন খুব অসুস্থ, সারা গায়ে মাথায় বেজায় চোট পেয়েছে।
দূর থেকে দেখতে পেয়ে, কিছুক্ষণ পর কাকটা উড়ে এসে বসল কাছের তেঁতুল গাছের ডালে। দুবার ডাকল, খা খা। সবসময়েই তার খাবার চিন্তা। ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ দেখল কাঁকড়াকাকাকে। কাঁকড়াকাকা নড়েও না, চড়েও না। কাকটা ধরেই নিল কাঁকড়াটা বুঝি মরে গেছে। তার কালো কালো ঠোঁটদুটো লোভে ফাঁক হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল,
‘আহা, কাঁকড়া খাবার এমন সুযোগ পাই নি বহুদিন। ভাবতে আমার মনটি নাচে ধা ধা তাধিন ধিন। করলে বেশি দেরি, জুটবে আরো কাক। আমার ভাগেই তখন পড়ে যাবে ফাঁক’

এই না ভেবে কাক উড়ে গিয়ে বসল শালুক পাতার ওপর। কাকের ভারে দুলে উঠল শালুকপাতা। জলের ভেতর ঢেউ উঠল গোল গোল। খুদিপানার সবুজ পাতাগুলোও দুলে উঠল ঢেউয়ের তালে তালে। খুদিপানার আড়ালে লুকিয়ে থাকা চিংড়ি আর শোল দম বন্ধ করে অপেক্ষা করতে লাগল, কী হয়, কী হয়! কাঁকড়াকাকা কিন্তু একটু নড়েও নি, চড়েও নি। মরার মতো শুয়ে থেকে দুলতে লাগল শালুকপাতার সঙ্গে। কাকটা এবার সরে এসে কাঁকড়াকাকার দু পাশে দুই পা রেখে দাঁড়াল, এবার ঘাড় তুলে ঠোকর মারবে মনে হয়। ঠোকর মারার আগে শেষবারের মতো চারপাশটা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে নিল, কোথাও কোন বিপদ আছে কিনা। কিচ্ছু নেই, এবার কাকটা দুবার ডাকল, খাই খাইসর্বদাই তার খাবার চিন্তা।
তারপর কাঁকড়াকাকাকে ঠোকর মারতে কাকটা যেমনি মাথা নামিয়েছে, কাঁকড়াকাকা এক ঝটকায় দাঁড়া দুটো দিয়ে, ক্যাঁক করে চেপে ধরল কাকের গলা। কাকটা ডানা ঝাপটিয়ে পালানোর জন্যে ছটফট করছিল, কিন্তু কাঁকড়াকাকার দাঁড়ার কামড় ছাড়াতে পারলে তো! কাঁকড়াকাকা, এবার কাকের গলা চেপে থেকেই, হাঁক দিল,
‘কোতায় গেলি, চিংড়িরানি, কোথায় গেলি শোল? দৌড়ে এসে দেখে নে, খাচ্ছে কেমন ঘোল। কাকব্যাটা হচ্ছে কেমন আমার হাতে জব্দ, মুখের থেকে শুনতে কী পাস কা কা কা শব্দ?’
চিংড়ি আর শোল জলের মধ্যে থেকে সবই দেখছিল, এখন কাঁকড়াকাকার ডাকে শালুক পাতার ওপর উঠে এল চিংড়ি, আর পাতার চারপাশে ঘুরে ঘুরে সাঁতার দিতে লাগল শোলমাছ। চিংড়ি বলল,
‘কেমন রে, কাক আর কী আমায় খাবি, নাকি কাঁকড়াকাকার দাঁড়ার চাপে যমের দোরে যাবি?’
কাক এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারল, সকালে ‘চিংড়ি লো, চিংড়ি, খাবো লো তোকে’ বলার জন্যেই, কাঁকড়া ব্যাণ্ডেজ বেঁধে মড়ার মতো শুয়েছিল শালুক পাতার ওপর, তাকে ধরবে বলে। কাক বেকায়দায় পড়ে, এখন চোখ মটকিয়ে কোন রকমে বলল,
‘না, না না, কাঁকড়াদাদা দাও গো এবার ছেড়ে, চিংড়ি খাবার বদবুদ্ধি ফেলেই দিলাম ঝেড়ে। চিংড়ি খাবার ইচ্ছে আমি করবো না গো আর, দমবন্ধ হওয়ার আগেই দাও গো আমায় ছাড়’
কাঁকড়াকাকা রাগী দুই চোখে তাকিয়ে কাককে কড়া ধমকে দিল,
‘চিংড়ি আমার ভাইঝি, রাখবি মনে কথা, কোনভাবেই চিংড়ি যেন, পায় না মনে ব্যথা। দিলাম এবার ছেড়ে, পরের বারে করলে এমন, রাখবো তোকে সেরে। যা উড়ে যা গাছের ডালে করবি না হাঁকডাক, এ পাড়াতে না দেখি আর, বুঝলি ব্যাটা কাক?’
  কাঁকড়াকাকার দাঁড়া থেকে ছাড়া পেতেই কাক ঝটপট উড়ে গিয়ে বসল জামরুল গাছের ডালে। সেখানে বসে অনেকক্ষণ নিজের গলায় হাত বোলালো। কাঁকড়াটা যা জোর চেপে ধরেছিল, গলায় দাগ বসে গেছে, উফ, প্রাণটা গিয়েছিল আরেকটু হলে। তারপর সেখান থেকেও সে উড়ে গেল কোথায় কে জানে।
কাঁকড়াকাকা ব্যাণ্ডেজ খুলতে খুলতে বলল, ‘এখন খুশি তো, চিংড়িরাণি, আর তোকে ওই কাক; তোর ব্যাপারে কোনদিন গলাবে না নাক’পাতা থেকে কাঁকড়াকাকা আর চিংড়িরাণি জলের মধ্যে ডুব দিল, তাদের সঙ্গী হল শোল। কাঁকড়াকাকা বলল, ‘চিংড়িরাণি, শোল, আমার বাড়ি চল; আমি খাব চা, তোরা কী খাবি বল। রান্না করে বসে আছে তোদের কাঁকড়াকাকি, চল এবারে সবাই মিলে কেমন হল চাখি’
কাক আর কাঁকড়াকাকার ঝটাপটিতে শালুকের পাতা খুব দুলছিল। আশপাশ থেকে দুলে দুলে দূরে সরে গিয়েছিল খুদিপানার ছোট্ট ছোট্ট পাতা। জলের নিচে ওরা ডুব দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে তারা আবার সরে এল, নিজেদের জায়গায়। এখন দেখে বোঝাই যায় না কিছু। খুদিপানার ছোট্ট পাতায় ঢাকা পড়ে গেছে পুকুরের স্থির জল।

--

ব্যাঘ্র যখন ব্যগ্র




("কিশোর ভারতী" পত্রিকায় প্রকাশিত)


তখন আমি তোমাদের মতোই ছোট্ট – সবুজ হাফপ্যান্ট আর হলুদ হাফহাতা জামা গায়ে দিই। ওই প্যাণ্ট আর জামা আমার ভীষণ প্রিয়, আমার রাঙা মাসীমা দিয়েছিলেন আমার দশবছরের জন্মদিনে। আর শীতকালে গায়ে থাকত লাল টুকটুকে ফুলহাতা সোয়েটার এটাও আমার ভীষণ প্রিয়, দিয়েছিল আমার মেজ পিসীমা। ক্লাসে আমি তখন তিন-চারটে নলওয়ালা চৌবাচ্চার জলে হাবুডুবু খাই। পিতা আর পুত্রের বয়েস গুলিয়ে পুত্রের থেকে পিতার বয়েস কম হিসাব করি। আর যে কোন সরল অঙ্কের সমাধান  করে অংকের মাষ্টারমশাইয়ের কানমলা খাই। কানমলা খাওয়ার কথায় মনে পড়ল, সেকালে আমাদের কানদুটো অধিকাংশ সময়েই গুরুজনদের হাতেই ধরা থাকত। আমাদের দুষ্টুমিও যেমন সারাদিন চলত, তেমনি কানমলাও চলত সমানুপাতিক হারে। আমাদের সেই সব দুষ্টুমির গল্প বলতে শুরু করলে, তোমাদের হাতপা নিসপিস করবে দুষ্টুমি করার জন্যে, আর তোমাদের গুরুজনদের হাত নির্ঘাৎ নিসপিস করে উঠবে, তোমাদের কানমলা দেবার জন্যে

আমাদের অ্যানুয়াল পরীক্ষা হত শীতকালে। পরীক্ষার পর কনকনে সেই শীতের দিনগুলোতেই আমাদের ছোটখাটো মফস্বল শহরে জড়ো হত, দেদার মজার ব্যাপার-স্যাপার। আর তার মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল সার্কাস। আমাদের কলেজ মাঠে বড়োদিনের কাছাকাছি এসে তাঁবু গাড়ত সার্কাসের দল। কোন এক রবিবারের দুপুরবেলা, মায়ের রান্না করা গরমমশলা দেওয়া কাঁকড়া-ফুলকপি-আলুর, আহা সে কী স্বাদ ঝোল দিয়ে মেখে একপেট ভাত। তার সঙ্গে খেজুর-আমসত্ত্ব-টোম্যাটোর চাটনি খেয়ে, আমরা দশবারো জন ভাইবোন সার্কাস দেখতে যেতাম। নানান বয়েসের ভাইপো-ভাইঝিদের নিয়ে আমাদের সঙ্গে যেতেন আমাদের ন’কাকা আর ছোটকাকা। সেদিন আমাদের সার্কাসের মজার সঙ্গে সঙ্গে মাথায় ঠকাঠক গাঁট্টা এবং কানমলাও জুটত বিস্তর।
আমাদের কাছে সার্কাস দেখার এই মজা তো ছিলই, তার থেকেও মজা ছিল সার্কাসের তাঁবুতে হানা দেওয়া। সার্কাসের দল বড়ো বড়ো গাড়ি নিয়ে শহরে আসার পরেও, সব যোগাড় যন্ত্র করে, তাঁবু খাটিয়ে গুছিয়ে বসতে বসতে দিন সাত দশ লেগেই যেত। আর সেই সময়টাতেই আমাদের কয়েকজন বন্ধুর বেজায় উৎসাহ বেড়ে উঠত। আমরা জলখাবার খেয়েই হাজির হতাম কলেজ মাঠের ধারে। সেখানে একধারে তখন বিশাল বিশাল কাঠের বল্লা আর রশা-রশি নিয়ে তাঁবু খাটানোর খুব তোড়জোড় অন্য দিকে সারি সারি খাঁচার মধ্যে বাঘ, ভালুক, হাতি, সিংহ, বাঁদর, কাকাতুয়া, কুকুর। আবার আরেকদিকে সারি সারি তাঁবুর মধ্যে সার্কাসের কসরত দেখানোর লোকজন থাকত। সেইসব তাঁবুর কাছাকাছি যেতে দেখলেই সার্কাসের লোকেরা আমাদের তাড়িয়ে দিত। বলত, “খোকারা, এখানে কী চাই? এখন নয়, এখন নয়, সার্কাস শুরু হলে, বাবা-কাকাদের সঙ্গে আসবে। যাও, যাও, এখন একদম ঘুরঘুর করবে না”
দুতিন দিন কিছুতেই সুবিধে করতে পারলাম না। শেষ অব্দি সার্কাসের দলেরই একজন ছোট্ট ছেলের সঙ্গে আমাদের আলাপ হল। তার নাম মুরুগান। আমাদের বয়সি হবে, সার্কাসের লোকেদের নানান ফাইফরমাস খাটে, আমাদের পাড়ার দোকান থেকে এটা সেটা জিনিষ কিনে নিয়ে যায়। দেখেই বোঝা যায় খুব গরিবের ছেলে। তার ভালো জামাপ্যান্টও ছিল না, কনকনে ডিসেম্বরের সকালেও তার সোয়েটার জুটত না। আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে আমার সঙ্গে তার বেজায় ভাব হয়ে গেল। একদিন মুরুগান সকাল সকাল বাজার করে ফিরছিল। আমি তাকে পাকড়াও করে, আমার জামা আর সোয়েটারটা জোর করে তাকে পরিয়ে দিলাম। আর তার জামাটা গায়ে চাপিয়ে, তার বাজারে ভরা থলেটা নিয়ে হাঁটা দিলাম সার্কাসের তাঁবুতে। যাবার সময় অবশ্য একপ্লেট ঘুগনি আর একটা পাঁউরুটি কিনে গণেশদার দোকানে তাকে বসিয়ে রেখে বললাম, “তুই এগুলো খা, আমি যাবো আর আসবো”
কোনদিন ভেতরে না ঢুকলেও, কদিন আশেপাশে ঘুরঘুর করার জন্যে কোনদিকে কী আছে, সেটা মোটামুটি জানাই ছিল। ওদের রান্নার জায়গাতে বাজারের থলেটা ঝুপ করে রেখে দিয়েই, আমি খাঁচাগুলোর দিকে দৌড় লাগালাম। বললে বিশ্বাস করবে না, জ্যান্ত বাঘ-সিংহ-ভালুকের এত কাছাকাছি, আমি কোনদিন যাইনি। আমার আর ওদের মধ্যে সামান্যই তফাৎ। একখানা গরাদ দেওয়া খাঁচার দেওয়াল! সিংহ আর ভালুকটা আমাকে মানুষ বলে গণ্যই করল না, আর কোন পাত্তাও দিল না। বাঘটা আমাকে দেখে বিশাল একটা হাঁই তুলল, নাকি মুখ ভেঙাল, ঠিক বুঝলাম না। তবে সে সারাক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে হ্যা হ্যা করতে লাগল। বড়ো খাঁচাগুলো পার হয়ে অনেকগুলো ছোটছোট খাঁচা। কোনটায় সাদা ধবধবে কাকাতুয়া, সবুজ চন্দনা, টিয়া, একটু বড়ো সাইজের খাঁচায় দুটো বাঁদর। এসব পেরিয়ে দুটো হাতিও দেখলাম। মাটিতে পোঁতা লোহার গোঁজের সঙ্গে মোটা শেকল দিয়ে বাঁধা। তারা এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে খালি দুলছিল, আর শুঁড় নাড়ছিল। তাদের নড়াচড়ায় শিকলে আওয়াজ উঠছিল ঝমঝম করে। হাতিরা আমাকে দেখে, তাদের শুঁড় বাড়িয়েছিল। আমি কিন্তু ঘাবড়ে একটু দূরে সরে এসেছিলাম। অবাক হয়ে হাতিদের যখন মন দিয়ে দেখছি, সেই সময় আমার কানে এল, কেউ যেন বলছে, “আমি ব্যগ্র, আমি ব্যগ্র”আশে পাশে কাউকে দেখতে পেলাম না, কিন্তু পিছন ফিরেই আমি আঁতকে উঠলাম। সর্বনাশ, এ যে বাঘ! মনে হয় খাঁচা খোলা পেয়ে বেরিয়ে এসেছে, আর এসে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক আমার পিছনেই!
ভয় পেলেও আমার একটা জিনিষ মনে হল, বাঘ কি কথা বলতে পারে? আর বাঘও কী আমাদের মতোই বাঙালী, যে বাংলায় কথা কয়? তবে দুটোর কোনটাই খুব অসম্ভব মনে হল না, কারণ ঠাকুমার কাছে পঞ্চতন্ত্রের অনেক গল্পেই শুনেছি বাঘ-ভালুকেরা দিব্যি কথা বলে। বরং অনেক মানুষের থেকেও ভালো বলে রাস্তায় ঘাটে হাটুরে বাটুরে লোকেরা যে ভাষায় কথা বলে, তাদের তুলনায় যথেষ্ট ভালো বাংলা বলে, আর সুন্দর সুন্দর উপদেশও দেয়। এই সব কথা মনে হওয়াতে মনে একটু সাহস হল, বললাম,
‘আপনি ব্যগ্র নন, ব্যাঘ্র’আমার কথায় বাঘটা বলল,
‘মোটেই না, ছোটবেলা থেকেই ব্যা ব্যা শুনে, ব্যা ব্যা খেয়ে আমরা grow করেছি, তাই আমরা ব্যাগ্র’আমি অবাক হয়ে বললাম,
‘ব্যাকরণ তো শুনতে হয়, পড়তে হয়। ব্যাকরণ আবার খাওয়াও যায় নাকি?’
‘তুমি বেশ বোকা আর বুদ্ধু বাচ্চা তো, ছাগলের দল ব্যা-ব্যা করলে, আমরা শুনি। আর তোমার মা আলু দিয়ে তাকে ঝোল বানিয়ে দিলে, রোববারে ভাত মেখে খাও না বুঝি?’ এবার আমি বুঝতে পারলাম, কিন্তু আমায় বোকা বলাতে আমি বেশ একটু রেগেই গিয়েছিলাম, আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
‘তাহলে, ব্যাঘ্র কথাটা কী ভুল’?
‘না, না। ওটাও ঠিক। ব্যা ব্যা খায়, কিন্তু ঘ্রাও ঘ্রাও ডাকে। তাই আমাদের ব্যাঘ্রও বলা যায়’
‘বাঘেরা সবাই খাঁচায় বন্দী, কিন্তু আপনি খাঁচায় না থেকে বাইরে কেন’?
‘যে বাগকে বাগে আনতে পারে, তাকে খাঁচায় পুরে দেয়। আমাকে বাগে আনতে পারেনি, কিনা? যেমন তোমাকেও তোমার বাড়ির লোকেরা, এমনকি এই সার্কাসের লোকেরাও বাগে আনতে পারেনি! তুমি ঠিক লুকিয়ে তাঁবুতে ঢুকে পড়েছ, সে রকম আর কী’! আমি একটু লজ্জা পেলাম, বললাম,
‘বারে, আমি তো দেখতে এসেছি। খাঁচার মধ্যে সিংহ, বাঘ কেমন থাকে’
‘আমিও তো তোমাকে দেখে খেতে এসেছি। বাচ্চা ছেলে কেমন খেতে’
‘সার্কাস থেকে তোমাকে খেতে দেয় না?’
‘দেয় বৈকি। রোজই কুমড়ো-পুঁইশাকের চচ্চড়ি, বাঁধাকপি-আলুর ঘ্যাঁট, ভাত আর ডাল। এমন খেলে আমাকেও ব্যা ব্যা করতে হবে। কোনদিন আর ঘ্রাও করতে পারবো বলে, তোমার মনে হয়’?
‘তা ঠিক। কিন্তু এই সার্কাসে আরো তো লোক রয়েছে, তাদের ছেড়ে আমাকে কেন’
‘বারে, তাও বুঝি জানো না? আমাদের দেখার জন্যে, তুমিই তো সব থেকে ব্যগ্র’

এই কথা  বলে, ব্যগ্রটা পা ভাঁজ করে, বাবু হয়ে ঘাসের উপর বসে পড়ল। বাঘকে এমন অদ্ভূতভাবে মানুষের মতো গুছিয়ে বসতে, আমি কোনদিন দেখিনি, এমনকি ছবিতেও দেখিনি। বসতে বসতে ব্যগ্র বলল,
‘না বাপু, চার পায়ে দাঁড়িয়ে তোমার সঙ্গে আর বকবক করতে পারিনা। এবার একটু বসি। তোমাকে খাবার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল, কিন্তু সে এখন আর হচ্ছে না’আমি বললাম,
‘কেন’?
‘ধুর ধুর, তুমি একদম অখাদ্য! তোমার রোগাভোগা চেহারা, গায়ে মাংসের ছিটেফোঁটা, সবটাই হাড়’
হাতের মাস্‌ল্‌ ফুলিয়ে আমি বললাম,
‘কে বলেছে আমার গায়ে মাংস নেই? এই তো দেখুন অনেক মাংস’!
   ‘ওটুকু মাংস আবার মাংস নাকি? ওতো আমার দাঁতের ফাঁকেই আটকে থাকবে, পেট পর্যন্ত আর পৌঁছোবে না’
‘ঠিক আছে ঠিক আছে। খান বা না খান সে আপনার ইচ্ছে। কিন্তু আমাকে অখাদ্য বলবেন না, আমার ছোটকা শুনলে...’
‘বলো কী? তার মানে তোমার ছোটকাও তোমাকে খাওয়ার চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু এদান্তিতে তিনিও তোমাকে অখাদ্যই বলেন, নাকি’! আমি ক্ষুণ্ণ মনে উত্তর দিলাম,  
‘বলেই তো, খুব বলে আর কানও মলে দেয়’
‘সে কি? এ তো ভারি অন্যায়। অখাদ্যও বলবে, আবার কানও মলে দেবে, এ তো ঠিক নয়। তা তোমার ছোটকা তোমার কান মলে দেন কেন? তুমি খুব দুষ্টুমি করো বুঝি’
‘তা একটু করি, তবে সে তেমন কিছু নয়’
‘আচ্ছা? তা তেমন কিছু নয়, এমন কিছু দুষ্টুমির দুএকটা নমুনা শোনাও দেখি, শুনি’
‘আমার বোনের একটা পুতুল ছিল, সেটাকে শুইয়ে দিলেই বড্ডো চোখ পিটপিট করতো?’
‘ভালোই তো, সুন্দর পুতুল’
‘না, না। চোখ পিটপিট করা মোটেই ভালো কথা নয়। আমি সন্ধ্যেবেলা পড়তে বসলেই ঘুমে চোখ পিটপিট করি বলে, মা খুব বকে’
‘অ, তাই বুঝি?’
‘হ্যাঁ, আর ছোটকার খুব প্রিয় একটা ফাউন্টেন পেন ছিল, সেটায় কখনও আমাকে হাত দিতে দিত না’
‘হাত দিতে দেয়নি, ঠিকই তো করেছে। তোমাকে দিলেই তো পেনটা খারাপ করে ফেলতে’
‘মোটেও ঠিক করেনি। যে কোন জিনিষ সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতে হয়, বাবা বলেছে’
‘ও বাবা, বাবা তাই বলেছে?’
‘হ্যাঁ। ছোটকার পেনের নিবের খোঁচা দিয়ে বোনের পুতুলের চোখটাকে আমি ঠিক করার অনেক চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হল না, বোনের পুতুলটাও গেল, আর ছোটকার পেনের নিবটাও বেঁকে বঁড়শি হয়ে গেল’
‘বোঝো। তখন কী করলে’?
‘কী আবার করবো? চিলেকোঠার ঘরে দুটোকেই লুকিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু বাড়ির লোক ঠিক খুঁজে পেয়ে গেল, আর কী করে যেন বুঝেও গেল, ওটা আমারই কীর্তি। তারপর আর কি? আমার জুটল, অনেক কিল, কানমলা আর গাঁট্টা। আর বোন পেয়ে গেল নতুন আরেকটা পুতুল আর ছোটকা নতুন ফাউন্টেন পেন! আমি নষ্ট করেছিলাম বলেই তো নতুন জিনিষগুলো পেল, সে কথাটা কেউ মনেও রাখল না’
শেষ কথাগুলো বলতে কষ্টে আমার গলাটা ধরে এল। সেই শুনে ব্যগ্র সহানুভূতি মাখানো গলায় বলল,
‘ইস, সত্যিই তো! ওরা পেলো নতুন পুতুল আর পেন, আর তুমি পেলে সেই পুরোনো একঘেয়ে কানমলা। তা এমন দুষ্টুমি কি আরও আছে, নাকি?’ আমি বেশ গর্বের সঙ্গে বললাম,
‘আছে বৈকি! সে সব তেমন কিছু নয়! আমার বড়দি স্কুলে গিয়ে ফুচকা, আচার, হজমিগুলি খাবে বলে, পয়সা সরিয়ে বুকশেলফের তাকে, বইয়ের পিছনে লুকিয়ে পয়সা জমাত। আর কেউ না জানলেও আমি জানতাম। দশপয়সা, সিকিটা, আধুলিটা এরকম আর কি? একদিন শুনলাম, কী একটা বাজে খরচের কথায়, বাবা মাকে বলছে, “আমার কি টাকার গাছ আছে নাকি, যে যাবো আর পাতা ছিঁড়ে টাকা করে নিয়ে আসবো’? এই কথা শুনে আমি বুঝলাম, টাকারও গাছ হয়। এবং আমাদের এমন একটা গাছ হলে, সকলেরই ভালোই হবে। আমাদের বাড়ির পিছনে বেশ কিছুটা জমি তখন খালিই পড়ে ছিল, ঠিক করলাম, ওখানেই চার/পাঁচটা গাছ লাগাবো, তাতে মায়ের হাত খরচের টাকার কিংবা বড়দির ফুচকা খাওয়ার পয়সার অভাব হবে না! বড়দির বইয়ের আড়াল থেকে সব পয়সা সরিয়ে নিয়ে, একদিন নির্জন দুপুরে, সব কটা পয়সা জমিতে পুঁতে দিলামবেশ কদিন ধরে রোজ দুবেলা জলও দিতাম। এর কদিন পর আমাদের মালি রামসুভগকাকা, তার দেশ থেকে ফিরে এল। পিছনের জমিতে ঢ্যাঁড়সের বীজ বুনতে গিয়ে, সেই মাটি খুঁড়ে সব পয়সা পেয়ে, তার সে কী আনন্দ! একমুঠো কাদামাখা পয়সা হাতে নিয়ে, রামসুভগকাকা মায়ের সামনে গিয়ে বলল, “মাইজি, মাইজি, হনুমানজিকা কিরিপাসে হামকো খাজানা মিল গয়ি।” তার এই কথায় সারা বাড়ি জুড়ে হৈচৈ পড়ে গেল, আর আমার কপালে জুটল সেই গাঁট্টা আর কানমলা’
‘হুঁম, টাকার গাছ হলে, সবার সমস্যা যে মিটে যেত, তোমার এই সুবুদ্ধিটা কেউ বুঝতেই পারল না? কী জানো, ছোটরা ছোট্টতো, তাই তারা ভেতরের খবর অনেক কিছু জানে। আর বড়োরা যত বই পড়ে, তত মুখ্যু হয়, আর ছোটদের কান মলে বেজায় মাতব্বরি করে।’
এরপর বাঘটা দু পায়ে সোজা উঠে দাঁড়ালো। আমার হাত ধরে বলল,
‘চলো, সার্কাসে সবার সঙ্গে তোমার আলাপ করিয়ে দিই। আমাকে ভয় পেও না, আমি একজন জোকার। বাঘের পোশাক পরে ছোটদের নানান মজা দেখাই। এখন আমাদের সঙ্গে একটু মজা করে নাও। এখানে এসেছ জানলে, বাড়ি ফিরে রোজকার মতো তোমার কানমলা আর গাঁট্টা না হয় পাওনা থাকুক’

-০০-


দিদুয়ার বাড়ি

("আনন্দমেলা" পত্রিকায় প্রকাশিত)




আমার তেমন কোন তাড়া নেই, তাই ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। হুড়মুড়িয়ে অনেক লোক এই স্টেশনে নামল, স্টেশন থেকে বেরোনর জন্যে তারা এমন হন্তদন্ত হয়ে গেটের দিকে দৌড়ল যেন মানুষখেকো বাঘে তাদের তাড়া করেছে। আমি ওই ব্যস্ততার মধ্যে নিজেকে জড়ালাম না। বাইরে বের হবার গেটের মুখে টিকিট কালেক্টর সায়েব দাঁড়িয়েছিলেন, তিনি সকলের টিকিট চেক করছিলেন। ভিড়টা একটু কমতে আমি গেটের দিকে এগোলাম। পকেট থেকে টিকিট বের করে ওঁনাকে দেখিয়ে, জিগ্যেস করলাম,
‘সিংহবাহিনী বাড়ি যাবো, রিকশা পেয়ে যাবো না?’ কালেক্টর সায়েব হাঁড়িপানা মুখ করে বললেন,
‘তার আমি কী জানি? আমি ট্রেনের খবর রাখি। সিংহ – টিংহর ব্যাপার আমি জানিও না, কোনদিন দেখিওনি। বাইরে রিকশাওয়ালাদের জিগ্যেস করুন’  

ধীরে সুস্থে প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে রাস্তায় এসে যেমনি পা দিলাম, অনেকগুলি রিকশওয়ালা আমায় ছেঁকে ধরল, ‘কোথায় যাবেন’, ‘এদিকে আসুন, এদিকে’, ‘এই ত্তো এই রিস্কাটা’ আমি বললাম,
‘সিংহবাহিনী বাড়ি যাবো, কত ভাড়া?’ একজন আমার কথার উত্তরে বলল,
‘সিংহবাহিনী বাড়ি? না না ওদিকে এখন যাবো না’আমি একটু অবাকই হলাম। ওই রিকশাওয়ালাটি যাবো না বলল, আর বাকি চার-পাঁচজন যারা দৌড়ে এসে আমাকে ঘিরে ধরেছিল, তারাও সকলে আমাকে পাত্তা না দিয়েই ফিরে গেল, আর অন্য খদ্দের ধরার জন্যে হাঁকাহাঁকি করতে লাগল। যে রিকশাওয়ালাটি আমাকে না বলল, কাছে গিয়ে তাকেই আবার জিগ্যেস করলাম,
‘ওদিকে যাবেন না, কেন?’
‘ইয়ে মানে...ওদিকটা তেমন সুবিধের জায়গা নয়, কিনাতার ওপর অনেকটা দূর, ফেরার পথে সওয়ারি পাওয়া যাবে না। সন্ধে হয়ে যাবে...ওদিকে এখন যাওয়া যাবে না। সকালের দিকে হলে যেতাম, এখন যাবো না’
বোঝো কাণ্ড। এর পর তো আর কোন কথা চলে না! রিক্সা স্ট্যাণ্ডের ওপাশে দেখলাম বেশ কয়েকটা টোটো দাঁড়িয়ে আছে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে তাদের দিকে এগোতে যাবো, এমন সময় আমার কাঁধে এক জন হাত রাখল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, খুব রোগা শুঁটকে চেহারার একজন বুড়োমানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন।
‘সিংহবাহিনী বাড়ি যাবে, পিকলুবাবু? আমার সঙ্গে এসো। ওরা যাবে না তো কী হয়েছে, আমি নিয়ে যাবো’ এই কথা বলেই বুড়ো লোকটি আমার হাত ধরে প্রায় টানতে লাগল।
এখানে সবই দেখি আজব কাণ্ড কারখানা! স্ট্যাণ্ডের রিকশাগুলো সবাই সিংহবাহিনী বাড়ি যেতে রাজি না হওয়ায় যতটা আশ্চর্য হয়েছিলাম, এখন এই বুড়ো লোকটির কথায় তার দশগুণ অবাক হলাম! আমি হুগলির এই ছোট্ট শহরে এলাম প্রায়, সতের বছর পর। শেষ বার যখন এসেছিলাম, তখন আমার বয়েস ছয় কি সাত। কিন্তু এই লোকটি আমায় চিনল কী করে? আমার নামই বা জানল কী করে? তার ওপর রিকশাওয়ালারা বলছিল, সিংহবাহিনী বাড়ি অনেকটাই দূর, সেক্ষেত্রে এই বুড়ো লোকটার রোগাভোগা শীর্ণ চেহারা দেখে আমি মোটেই ভরসা করতে পারছিলাম না। কোন বদ মতলব নেই তো? তবে আমার কাছে আছেটাই বা কী? আর ওই লোকটির যা বয়েস আর চেহারা, তাতে বদমতলব আর কী থাকতে পারে?
রিকসা স্ট্যাণ্ডের পিছনদিকে একটা মস্ত ঝাঁকড়া মাথা মহানিম গাছ। যত না পাতা, তার থেকে বেশি পাখি। বিকেলে সব বাসায় ফিরে এমন কিচিরমিচির লাগিয়েছে, সেই শুনে মনটা শান্ত হয়ে গেল, চিন্তা হীন হয়ে মাথাটাও হালকা হয়ে গেলসেই গাছের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা ভাঙাচোরা রিকশর সামনে নিয়ে গিয়ে বুড়ো লোকটি আমাকে বলল,
‘চটপট উঠে পড়ো পিকলুবাবু, ওরা দেখলে আবার তোমায় ব্যাগড়া দেবে’লজঝরে সেই রিকশাতে উঠতে উঠতে আমি বললাম,
‘আপনি আমায় চিনলেন কী করে? আর আপনার রিকশার যা হাল তাতে এটা সিংহবাহিনী বাড়ি অব্দি পৌঁছবে তো?’ হ্যা হ্যা করে খুব খানিক হেসে বুড়ো লোকটি বলল,
‘পৌঁছবে মানে, দৌড়ে দৌড়ে পৌঁছবে! ও নিয়ে তুমি ভেবো নি, পিকলুবাবু’
আমি রিকশায় উঠে বসতেই, বুড়ো লোকটি তার সাইকেলের সিটে বসে, প্যাডেল করতে শুরু করল, তারপর ঝরঝরিয়ে গড়াতে লাগল রিকশাটা। স্ট্যাণ্ডে দাঁড়ানো রিকশাগুলোর পাশ দিয়ে আমাদের রিকশাটা যখন স্টেসন চত্বরের বাইরে বের হয়ে এল, তখন দেখলাম রিকশাওয়ালাদের কেউ কেউ হৈ হৈ করে চেঁচাতে লেগেছে,
‘ও খোকাবাবু, ও খোকাবাবু, ও রিকশায় যেও নি, সব্বোনাশ হল গো, এ হে হে নতুন লোক....’

ওদের কথা শেষ হবার আগেই আমরা বড়রাস্তার ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছি, তাই তাদের বাকি কথা শুনতে পেলাম না। বড়ো রাস্তার ভিড়ভাট্টা জ্যামট্যাম ছাড়িয়ে একটু ফাঁকা রাস্তায় যখন এসে পড়লাম, বুড়ো লোকটিকে জিগ্যেস করলাম,
‘আপনি আমায় চিনলেন কী করে, সেটা তো বললেন না?’
সামনের দিকে তাকিয়ে বুড়ো লোকটি বলল,
‘তুমি বুড়িঠাকমার পুতি তো, তোমাকে চিনব নি’? আমি আরো অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম,
‘পুতি? পুতি মানে’? প্যাডেল করতে করতে বুড়ো লোকটি বলল,
‘বুড়িঠাকমার মেয়ে, তোমার মায়ের পিসিমা হন। থালে তোমার মা, বুড়ি ঠাকুমার নাতনি হলেন কিনা? আর তুমি পুতি হলে কিনা? আর আমাকে তুমি দেখেছ, মনে নেই। আমি লক্ষ্মণ বাগ – লখাই, বুড়িঠাকমার বাঁধা রিকশাওয়ালা। বুড়িঠাকমার বাজার হাট করে দেওয়া, বচ্ছরকার দিনে মন্দিরে নিয়ে যাওয়া, অসুখ বিসুখ হলে ডাক্তারবদ্যি করা – এ সব আমিই করি।  তোমরা শেষবার যখন এসেছিলে, তুমি, তোমার মা আর বাবাকে আমিই স্টেশন থেকে নিয়ে এসেছিলাম, আবার ফেরার সময় আমিই স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিলাম। তুমি তখন ছোট্টটি, মনে না থাকারই কথা’
ঝরঝরে রিকশাটা যতটা ভাঙাচোরা মনে হয়েছিল, এখন দেখছি ততটা নয়। রাস্তাও বেশ ভালো। লখাইমামা চালাচ্ছিলও বেশ। এত মসৃণ যেন ঢাকনা খোলা মোটরগাড়িতে চড়েছি। লখাইমামার কথায়, সে বারের কথা আমার আবছা আবছা মনে পড়ল ঠিকই, আমরা রিকশ চেপে স্টেশন ফিরেছিলাম, সেটাও মনে পড়ল। তবে লখাইমামার নাম আর চেহারা কিছুতেই মনে করতে পারলাম না। আমি জিগ্যেস করলাম,
‘দিদুয়ারা কেমন আছেন, এখন? ভালো আছেন তো?’
‘অ্যাই, তুমি বলাতে মনে পড়ল। তোমার মা পিসিমার মাকে ‘দিদুয়া’ বলত। দেখেছ, এই কথাটা আমি ভুলে গেছিলাম, পিকলুবাবু। হ্যাঁ, তা ভালই আছেন। এই বয়েসে যতটা ভালো থাকা যায়, সে তুলনায় যথেষ্ট ভালো আছেন। তা তুমি কী কোন খবর পেয়ে এসেছ? নাকি এমনিই হুট করে দেখা করতে চলে এলে’?
‘না, না, লখাই মামা, অনেকদিন কোন খবর পাইনি বলেই হুট করে খবর নিতে চলে এলাম’
‘বাঃ, তোমার মুখে লখাইমামা ডাকটি বেশ লাগল। তা একটা কথা জিগ্যেস করবো? কিচু মনে করবে নি তো, পিকলুবাবু’?
‘না না, মনে করবো কেন, বলো না, লখাইমামা’
‘অ্যাদ্দিন পর, হঠাৎ করে বুড়িঠাকমাদের দেখার, খবর নেওয়ার কথা মনে পড়ল কেন’?
সত্যি এই প্রশ্নে আমি খুব অস্বস্তিতে পড়লাম। বড়োরা নিজেদের নানান কাজের ফাঁদে এমন জড়িয়ে যান, অসহায় স্বজন, পরিজনদের খবর নেওয়ার কাজটা, ইচ্ছে থাকলেও সবসময় করে উঠতে পারেন না। আমি বললাম,
‘আমরা সেবার এখান থেকে ফেরার কয়েকমাস পরেই অফিস থেকে বাবাকে ব্যাঙ্গালুরু পাঠিয়ে দিল। আমরাও বাবার সঙ্গে ওখানে চলে গেলাম, আর আমি ওখানেই স্কুলে ভর্তি হলাম। ওখান থেকে আবার অফিসের কাজে, বাবাকে প্রায়ই বিদেশে যেতে হত। এই সবের জন্যে এদিকে আর আসাই হয় নি। আমার কলেজের পড়া এই সবে শেষ হল। একটা চাকরিও পেয়ে গেলাম। তাই মা বললেন, “চল অনেকদিন কলকাতায় যাওয়া হয়নি, কটা দিন ঘুরে আসি”কলকাতায় আসার পর মাও বললেন, আর আমারও দিদুয়াকে একবার দেখার ইচ্ছে হচ্ছিল, তাই চলে এলাম’
‘বাঃ বেশ করেছ, যাওয়া আসা না করলে কী আর সব খবরাখবর পাওয়া যায়? তবে পিকলুবাবু, তুমি তো এখন সত্যিই বাবু হয়ে গেছ, দেখছি! পড়াশোনা শেষ, চাকরি করছো। কত্তো বড়ো হয়ে গেছ! দেখতে দেখতে কতগুলো বছর চলে গেল, নয়?’
ছোট্ট শহর ছাড়িয়ে আমরা এখন মাঠের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলেছি, দু পাশে ধানের ক্ষেত। পড়ন্ত বিকেলে বেশ লাগছিল চারপাশ। আমি লখাইমামাকে জিগ্যেস করলাম,
‘আর কতদূর, লখাইমামা’?
‘এ হে তুমি দেখছি একেবারেই ভুলে গেছ। তা ভুলে যাওয়ারই কথাই অবিশ্যি। আর বেশি দূর নেই গো, ওই সামনের মাঠটা পেরিয়ে মন্দির তলা, তার বাঁদিকের রাস্তা ধরে একটু এগোলেই তোমার দিদুয়ার বাড়ি। তোমার দিদুয়া কিন্তু খুব চমকে যাবে, তোমাকে দেখে। আমি অবিশ্যি খবর দিয়ে দিয়েছি।’
‘খবর দিয়ে দিয়েছ? কখন দিলে?’ আমি খুব অবাক হলাম, কই ওকে একবারও তো মোবাইলে কথা বলতে দেখলাম না। আর লখাইমামার যা চেহারা, ওর কাছে মোবাইল ফোন থাকাটাও কিছু কম আশ্চর্য নয়!
‘গোমড়ামুখো টিকিট চেকারকে তুমি যখন জিগ্যেস করলে সিংহবাহিনী বাড়ি যাবার রিস্কা পাওয়া যাবে কিনা, তখনই বুঝে গেছি। আর খবরও পাঠিয়ে দিয়েছি’
‘বলো কী? তখনই আমাকে চিনতে পেরেছিলে’? লখাইমামা হাসল, বলল,
‘তবে? লখাই বাগের বয়েস হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কিছুই ভোলে নি। আর তাছাড়া তিন কূলে যে দুই বুড়ির কেউ নেই, তাদের খোঁজে কলকাতার ছেলে আর কে আসবে? তুমি ছাড়া?’
কথা বলতে বলতে আমাদের রিকশাটা মন্দিরতলার সামনে দিয়ে এগিয়ে বাঁদিকে সাঁৎ করে মোড় নিল। মন্দিরের চাতালে কয়েকজন বসেছিল, তারা আমাদের দেখে কেন যে অমন চমকে উঠে দাঁড়াল, সেটা বুঝলাম না। লখাইদাদার রিকশওয়ালা হিসেবে খুব একটা সুনাম নেই বুঝতে পারছিলাম, অনেক লোককেই ধাক্কা-টাক্কা মেরে বেশ বদনাম কুড়িয়েছে। কাছাকাছি এলেই তাই লোকজন ছিটকে সরে যাচ্ছে, নয়তো আতঙ্কে চমকে উঠছে।
বিশাল ভাঙাচোরা পোড়ো বাড়িটার সামনে লখাইমামা রিকশটাকে যখন দাঁড় করাল, তখন সুয্যিমামা পাটে বসে গেছেন, আকাশে শেষ আলোর রেশটুকু শুধু রয়ে গেছে। আমি পার্স থেকে টাকা বের করে লখাইমামাকে জিগ্যেস করলাম,
‘কত দেব, মামা’? লখাইমামা রিকশটা বাড়ির পিছনদিকে টানতে টানতে বলল,
‘অ্যাঃ, মামাও বলবে, আবার ভাড়াও দেবে? অ্যাদ্দিন পরে এলে, সবে চাকরি পেয়েছ, পেট পুরে মিষ্টি খাইয়ে দিও’ বলেই খুব খানিক হাসল, তারপর আবার বলল, ‘সে পেটই নেই, তা আবার মিষ্টি খাওয়া!’ 
আমি কিছু বলতে পারলাম না, টাকা কটা আবার পার্সে ঢুকিয়ে পশ্চিম আকাশের রঙ দেখতে দেখতে ভাবলাম, এই মানুষগুলোও দিন-দিন বিরল প্রজাতি হয়ে যাচ্ছে! বাঘ সিংহ হাতি গণ্ডার সংরক্ষণের জন্যে যেমন বিশ্বজুড়ে নানান প্রকল্প চলছে, এদের জন্যে তেমন একটা কিছু করা, খুব দরকার।


‘ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রাত কাবার করে দিবি নাকি রে, মুখপোড়া?’
দিদুয়া! এই ডাক, এই গলা শুনে আমার সেই ছোট্টবেলাকার ভুলে যাওয়া স্মৃতি আবার ফিরে এল। পিছন ফিরে দেখলাম, দিদুয়া বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, তাঁর বাঁ হাতে হ্যারিকেন। বয়েসের ভারে কোমর ভেঙে গেছে, সোজা দাঁড়াতে পারেন না। সূর্যডোবা মৃদু আলো এখনো রয়েছে, সেই আলোয় তাঁর আবছা মুখের দিকে তাকালাম। গালের, কপালের ত্বক কুঁচকে গেছে, কিন্তু ফোকলা মুখের হাসিটি ঠিক তেমনই আছে, যেমনটি দেখেছিলাম, আজ থেকে প্রায় সতের বছর আগে! ওই হাসিতে মিশে আছে আন্তরিক ভালোবাসা আর অদ্ভূত মায়াময় এক আনন্দ। আমি কাছে গিয়ে, পা ছুঁয়ে প্রণাম করলাম, জিগ্যেস করলাম,
‘কেমন আছ, দিদুয়া?’ আমার চিবুক ছুঁয়ে উনি চুমো খেলেন, তারপর ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন,
‘আয়, আয় আগে ভেতরে আয়। মুখেচোখে একটু জল দে, কিছু খা। তারপর সব কথা হবে’ দিদুয়ার পিছন পিছন আমি বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে জিগ্যেস করলাম,
‘পিসদিদা কোথায়?’
‘কোথায় আবার, রান্নাঘরে? যেমনি শুনেছে, তুই আসছিস, সেই যে সে রান্নাঘরে ঢুকেছে, তার আর বেরোবার নামটি নেই রান্নাবান্না করা আমার আর ক্ষমতায় কুলোয় না, জানিস? বয়েস তো আর কম হল না, বাছা’
দালান পেরিয়ে পাশের বড়ো একটা ঘরের মধ্যে আমাকে নিয়ে গেলেন দিদুয়া, বললেন,
‘এই সেই ঘর, মনে আছে? তোরা এসে এইখানেই থাকতিস। শেষ বার যখন মা-বাবার সঙ্গে এসে  দিন তিনেক ছিলি, এই ঘরেই ছিলি। মনে পড়ছে’? আমার মনে পড়ল না, আমি হাসলাম। দিদুয়া বললেন,
‘তা সে মনে না পড়ারই কথা। তখন তুই আর কতটুকু? তোর মা মুখপুড়ি সেই যে গেল, আমাদের তো ভুলেই গেল’ আমি মায়ের হয়ে বলতে গেলাম,
‘না গো দিদুয়া, মা মোটেই ভোলেনি, মাই তো আমাকে পাঠালো তোমাদের খবর নেওয়ার জন্যে। আমরা অনেকদিন বাইরে ছিলাম কি না, তাই এদিকে আর আসা হয়নি। মায়ের কোন দোষ নেই গো!’
‘নে নে, মেলা বকিস না, সেদিনের সেই এতটুকু মুখপোড়া পিকলু কতবড়ো হয়ে গেছিস! এখন আবার দিদুয়ার কাছে, মায়ের হয়ে সাউখুরি করছিস? এই সেদিন তোর মাকে আমি জন্মাতে দেখলাম – তোর মাকে আমি বেশি দেখেছি, না তুই?’
এ কথায় হেসে ফেললাম, কোন উত্তর দিলাম না, ঘরের মধ্যে হ্যারিকেনটা রেখে দিয়ে দিদুয়া বললেন,
‘নে জামাকাপড় ছেড়ে নে। কলতলায় জল ধরা আছে, মুখ হাত ধুয়ে নে। তোরা পিসদিদা খাবার আনছে’
বলতে বলতে দিদুয়া ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। আমিও পিঠের থেকে ব্যাগ নামিয়ে বিছানায় রাখলাম। তারপর ব্যাগ খুলে বের করলাম, দিদুয়া আর পিসদিদার জন্যে শাড়ি, শায়া ব্লাউজ। একবাক্স সন্দেশ। চিনি দেওয়া দুপ্যাকেট বিস্কুট, এক প্যাকেট চানাচুর। কাঠের টেবিলের ওপর সেগুলো সাজিয়ে রেখে, আমি নিজের পাজামা, পাঞ্জাবি, তোয়ালে, চপ্পল বের করলাম। সাবানও নিয়ে এসেছিলাম, সাবানটা নিয়ে তোয়ালে পরে, ঘরের বাইরে এলাম কলতলার খোঁজে। বসার ঘরের ওদিকের দরজা দিয়ে, বেরিয়ে, বাড়ির ভেতরের দিকে একটা ছোট্ট উঠোন পেলাম। তার বাঁদিকের বারান্দার দেওয়ালে একটা লন্ঠন জ্বলছে, সেই আলোয় টিউব ওয়েলটা চোখে পড়ল। সেটার সামনে গিয়ে দেখলাম, বড় পরিষ্কার একটা বালতিতে জল ভরা রয়েছে, আর তার ওপরে ভাসছে লাল টুকটুকে একটা প্লাস্টিকের মগ সবই নতুন, আনকোরা, বালতির গায়ে এখনো লেবেল চিপকানো রয়েছে।
ব্যবস্থা ভালই লাগল, কিন্তু দুই থুত্থুড়ি বুড়ি আমার জন্যে কল টিপে জল ভরে রেখে দেবে, আর আমি সেই জল ব্যবহার করবো, এটা আমার পছন্দ হল না। এখন কিছু করার নেই, তবে ঠিক করলাম, এর পরে আর এমন করতে দেব না। সাবান দিয়ে মুখ হাত পা ধুয়ে বেশ ভালই লাগল। বালতির যেটুকু জল খালি হল, সেটা এই বার ভরে নিই, এই ভেবে যেমনি টিউবওয়েলের হ্যান্ডেলে হাত দিয়েছি। অন্ধকার থেকে লখাইমামা চেঁচিয়ে উঠল,
‘আরে করছো কি, বুড়িঠাকমা দেখতে পেলে আমার পিণ্ডি চটকে দেবে। যাও যাও, ঘরে যাও দিকি, তোমার জন্যে পিসদিদা নুচি, আলুরদাম আর মোহন ভোগ বানিয়েছে’লণ্ঠনের আলোয় লখাইমামার চোখদুটো চিকচিক করছিল। আমি আর কথা না বাড়িয়ে বারান্দায় উঠে এলাম, বললাম,
‘রাত্রে কি তুমি এখানেই থাকো, লখাইমামা’?
‘হুঁ, কোতায় আর যাবো বলো? বুড়ি দুটো বড্ডো অসহায়, তিনকুলে কেউ নেই। আর বলতে গেলে আমার জন্যেই তো এসব হল...’ লখাইমামার কথা শেষ হবার আগেই, দিদুয়ার গলা পেলাম, বসার ঘরের দরজায়, কোমরে হাত দিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, তিনি বললেন,  
‘লখাই...কথা কওয়ার জন্যে সারারাত পড়ে আছে, এখন ছেলেটাকে খেতে দে, একটু বিশ্রাম নিতে দে। এতখানি বয়েস হল, তোর কী একটুও সুজবুঝ হবে না রে, মুখপোড়া’? আমি ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে দিদুয়াকে জিগ্যেস করলাম,
‘তোমার কাছে কী সবাই মুখপোড়া, দিদুয়া? আমি, মা, লখাইমামা...মাঝে মাঝে ভাবি ওটা তুমি ভালোবেসে বলো, নাকি রাগ করে বলো?’ আমি হাসতে হাসতে বললাম। দিদুয়া বলল,
‘তোর অত খোঁজে কী দরকার, রে পোড়ারমুখো? মিনু তোর জন্যে খাবার কোলে বসে আছে, তাড়াতাড়ি যা’
মায়ের পিসিমা, আমার পিসদিদার নাম মৃণালিনী, ডাক নাম মিনু। মায়ের এই পিসিমা মায়ের বাবার খুড়তুতো বোন। বিয়ের পরেই খুব অল্প বয়সে মায়ের পিসেমশাই মারা গিয়েছিলেন। দিদার তো কোন ছেলেপুলেও নেই, সত্যি বলতে আমরা ছাড়া তিনকূলে কেউ নেই ওঁদের।
ঘরে ঢুকে চটপট জামা কাপড় বদলে রেডি হতে হতেই, পিসদিদা এল। বড়ো একটা কাঁসার থালায়, লুচির পাহাড়, আর কাঁসার বাটি ভরা আলুর দম। কাঠের টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন,
‘শুরু কর, গরম গরম ভেজে আরো আনছি’তারপর টেবিলের ওপর আমার আনা জিনিষপত্রগুলো দেখে বললেন, ‘এগুলো কে পাঠালো, অনু? মেয়েটার কোনকালে আর বুদ্ধিশুদ্ধি হল না, সেই একইরকম ছেলেমানুষ রয়ে গেল। আমাদের আর এসব খাওয়া পরার অবস্থা আছে?’  
আমি পা ছুঁয়ে পিসদিদাকে প্রণাম করলাম, পিসদিদাও আমার চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেলেন। তারপর বিছানার এক ধারে বসে বললেন,
‘শুরু কর, ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। আমি আরো আনছি’আমি কথা না বাড়িয়ে একটা লুচি ছিঁড়ে মুখে পুরলাম। তারপর বললাম,
‘দিদা, এই লুচির পর আর একখানা লুচিও যদি আনো, আমি এখনই কলকাতা ফিরে যাবো’দিদা আমার এই কথায় যেন শিউরে উঠলেন, বললেন,
‘সেই কোন সকালে বেরিয়েছিস, এতটা পথ। ওই কটা লুচিতে কী হবে শুনি? না খাইয়ে খাইয়ে, অনু তোর পেট একদম মেরে দিয়েছে’অনু আমার মায়ের নাম, অনুশ্রী। আমি হেসে ফেললাম, বললাম,
‘তোমার পাল্লায় পড়লে আমি এতদিনে বক রাক্ষস হয়ে উঠতাম, দিদা’
‘নে, নে বেশি বাহাদুরি করিস না, রাতের বেলা রাক্ষস- খোক্কসের কথা কেউ বলে নাকি? রাতে কী খাবি? এই অবেলায়, এত কম সময়ে তেমন যোগাড়টোগাড় করতে পারলাম না, মাছের ঝোল বেগুনভাজা, ঘি আর ভাত। ঠিক আছে?’
‘এখন এই লুচির পাহাড়ের পর, রাত্রে আবার ভাত? দিদা, প্লিজ...’
আমাদের কথার মধ্যে, দিদুয়া ঘরের মধ্যে এলেন, বললেন,
‘মিনু, তোর আবার ভুলে যাওয়ার ব্যারাম আছে, মোহনভোগের বাটিটা নিয়ে আয়, আর ওই সঙ্গে খানকতক লুচি’
‘তোমরা দুজনে কি আমাকে খাইয়ে খাইয়েই মেরে ফেলবে নাকি?’ এবার আমি একটু বিরক্ত হয়েই বললাম। দিদুয়া আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন,
‘আচ্ছা, ছাড়। আজকালকার এই ছোঁড়াদের না খেয়ে থাকাটা বেশ একটা পাকামি হয়েছে। লুচি না নিক, মোহনভোগটা তো নিয়ে আয়, মিনু’




একপেট খেয়ে আমার হাঁসফাঁস অবস্থা। দুজনে মিলে যেভাবে চেপে ধরেছেন, রাত্রে ভাত খেতে বসে, আমাকে যে লড়াই করতে হবে, সেটা বেশ টের পেয়ে গেলাম। খাবার পর পিসদিদা এঁটো থালা তুলে নিয়ে যেতে, দিদুয়া বললেন,
‘বেশ ক বছর হল, আমাদের এ বাড়িতে বিজলি নেই। বিল-টিল ভরা হয় না বলে, কেটে দিয়ে গেছে। এ ঘরে তোর ভালো লাগবে না, ওপরের ছাদে চ, খোলা হাওয়া একটু গায়ে লাগলে, আরাম পাবি। অবিশ্যি আজ আবার কৃষ্ণপক্ষের একাদশী। জ্যোৎস্নাও থাকবে না তেমন’
কথাটা আমার মনে ধরল। ঘরের ভেতরটা সত্যিই খুব গুমোট। আর অনেক দিন বন্ধ থাকা ঘরে, কেমন যেন একটা গন্ধ হয়, সেটাও খুব অস্বস্তিকর লাগছিল।
আমরা তিনজনে উপরে চললাম, হাতে হ্যারিকেন নিয়ে একদম সামনে দিদুয়া, মাঝখানে হাতে মাদুর নিয়ে পিসদিদা। ছাদে উঠে সত্যি বেশ ভালো লাগল। মোটামুটি চওড়া বড় ছাদ, চারদিকে নিরেট অন্ধকার। মাথার উপরে আরেকটা বিশাল ছাদ – ঝকঝকে তারায় ভরা। এত পরিষ্কার তারায় ভরা আকাশ, আমি ব্যঙ্গালুরু বা কলকাতাতে দেখিনি। শহরের আকাশগুলো অন্যরকম হয়। পিসদিদা ছাদের একদম মাঝখানে মাদুরটা বিছিয়ে দিলেন, তারপর বললেন,
‘আয় বোস, ইচ্ছে হলে শুতেও পারিস। ছাদের ধারের দিকে একদম যাবি না, পুরোনো বাড়ি - ছাদের আলসে অনেক জায়গাতেই ভাঙা আছে’
আমি মাদুরে বসতে, দিদুয়াও বসলেন। বললেন,
‘বেশিক্ষণ আর দাঁড়াতে পারি না, কোমর ধরে যায়। বসলে কিংবা শুলে আরাম পাই। মিনু, চোখে লাগছে, হ্যারিকেনটা কমিয়ে দে না। অন্ধকারই ভাল’পিসদিদা হ্যারিকেনের সলতেটা কমিয়ে ছোট্ট করে দিতে, আলোটা কমে গেল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্ধকার যেন দৌড়ে এসে ঘিরে ধরল আমাদের। একটু পরে, অন্ধকারেও চোখ সয়ে গেল, আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছিলাম। আমাদের ছাদের পাশেই একটা বিশাল গাছ দেখলাম ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্ধকারে চিনতে পারলাম না। কাল সকালে দেখতে হবে, কী গাছ।
নিচের ঘরে অনেকবার দেখেছিলাম, আমার মোবাইলে নেটওয়ার্ক নেই। দুবার রিস্টার্ট করেও দেখলাম। ভেবেছিলাম ছাদে হয়তো নেটওয়ার্ক পেয়ে যাবো, পেলাম না। বাবা মা নিশ্চয়ই বার বার চেষ্টা করছেন, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্যে। স্টেসনে নেমেই মাকে একটা ফোন করলে, মা কিছুটা নিশ্চিন্ত হতেন, এখন নিশ্চয়ই চিন্তায় ছটফট করছেন। কিন্তু কিছু করার নেই, আজকাল ফোনে নেট ওয়ার্ক না থাকলে মনে হয় সভ্যজগতের বাইরে বসে আছি। অবিশ্যি এই ছাদে বসে অন্ধকারে যতদূর চোখ যায়, তার মধ্যে কোন লোক বসতি চোখে পড়ছে না। এমনকি লোকজনের কোন শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। বহুদূরে মাঝে মাঝে কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছে। আর কাছাকাছির মধ্যে রাতচরা কোন এক পাখির ডাক শুনতে পাচ্ছিলাম, টিট-টি টিট-টি...আর কোন শব্দ নেই চারপাশে।      
ছাদে বসে খোলা হাওয়ায় বেশ ভালই লাগছিল। তিনজনে বসে নানান গল্প শুরু হল। আমার এবং বাবা মায়ের কথা থেকে ওঁনাদের ছোটবেলার নানান কথা শুনতে শুনতে কতক্ষণ কেটে গেল কে জানে? এখানে সময়ও যেন অনেক হাল্কা চালে চলে, শহরের মতো সর্বদাই ব্যস্ত নয়। পিসদিদা কথা বলতে বলতে একসময় ঝিমোতে লাগলেন, মনে হল। কিন্তু দিদুয়ার কোন ক্লান্তি নেই এক নাগাড়ে বকেই চলেছেন। হঠাৎ কী মনে হতে, দিদুয়া জিগ্যেস করলেন,
‘কটা বাজছে, রে?’ আমার মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। অন্ধকারে ঘড়িটাও দেখা যাচ্ছিল না। দিদুয়া হাত বাড়িয়ে হ্যারিকেনটা উস্কে দিয়ে বললেন,
‘দেখতো কটা বাজে?’ হ্যারিকেনের আলোয় ঘড়ি দেখে বললাম,   
‘এগারোটা দশ’শুনেই দিদুয়া খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, বললেন,
‘সে কি রে? এই মিনু, মিনু? কত রাত হয়ে গেল, দ্যাখ। ওঠ, ওঠ, পিকলুকে খেতে দিয়ে দে, ও শুয়ে পড়ুক। এখনি বারোটা বেজে যাবে...ওঠ ওঠ শিগ্‌গির নিচেয় চল’

রাতে বেগুনভাজা দিয়ে ঘি মাখা ভাত, তারপর অনেক রকম সবজি দিয়ে চারাপোনার ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে যখন শুতে গেলাম তখন বারোটা বাজতে আর মিনিট দশেক বাকি। শোবার সময় মনে হল, কলকাতা হোক, ব্যাঙ্গালুরু হোক, এমন একটা অদ্ভূত পরিবেশে কোনদিন রাত কাটাইনি। কিন্তু মন্দ লাগছে না। এই বাড়ি, তার সঙ্গে এই দুই বুড়ির আন্তরিক আদর আপ্যায়ন সব কিছুই কেমন যেন অন্য জগতের মনে হচ্ছে। আজকের দিনেও দারুণ ব্যস্ত সভ্য দুনিয়ার এত কাছে থেকেও – এমন একটা রাত্রিযাপন যে সম্ভব – এ কথা তো স্বপ্নেও ভাবিনি।
অন্ধকার ঘরে শুয়ে শুয়ে নানান কথা চিন্তা করতে করতে, একটা কথা হঠাৎ মনের মধ্যে কেমন যেন খটকা এনে দিল। লখাইমামা যে বলল দিদুয়াকে খবর দিয়ে দিয়েছে, কী করে দিল? এখানে তো নেট ওয়ার্কই নেই। কাল সকালে এটার খোঁজ নিতে হবে, নেটওয়ার্ক ছাড়াই যদি দিদুয়ার সঙ্গে কথা বলা যায়, তার চেয়ে মজা আর কী হবে? তবে এটা বোধহয় আমাদের জন্যে নয় - দিদুয়া, দিদা আর লখাইমামা ছাড়া এ নেটওয়ার্ক অচল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পা দেওয়া থেকে, এই ঘরের বিছানায় এখন এই যে শুয়ে আছি, এটা সম্পূর্ণ আলাদা একটা ব্যাপার! এটা আমার জন্যেই স্পেশাল, অন্য কেউ এলে হয়তো প্রাণটাই দিত বেঘোরে! তবে এখন আমারও একটু অঘোর হলে মন্দ হত না, ইয়ে মানে অঘোর ঘুম আর কি!          






রাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানিনা, ঘুম ভাঙল খুব ভোরে, গাড়ির জোরালো হর্নের আওয়াজে। মনে হচ্ছে, জানালার সামনেই গাড়ি থামিয়ে কেউ হর্ন দিচ্ছে! আমি বিছানায় উঠে বসলাম, সদর দরজা দিয়ে অনেকে ঢুকে আসছে, অনেকগুলি উত্তেজিত গলার আওয়াজও পাচ্ছি। তার মধ্যে দুটো গলা আমার খুব চেনা, একটি মায়ের আরেকটি আমার বাবার। আমি আশ্চর্য হয়ে বিছানা থেকে নেমে বাইরের ঘরের দিকে গেলাম, আর বাইরের ঘরেই বাবা ও মায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। মা দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, আমার মুখে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,
‘ঠিক আছিস তো রে, পিকলু? কাল সন্ধে থেকে আমাদের যে কী গেছে! তুই ফোন করিসনি কেন? তোর বাবা আর আমি অন্ততঃ দুশোবার ফোন করেছি!’ বাবা কিছু বলছিলেন না, আমার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে কিছু দেখছিলেন। বাবার পিছনে আরো দুজন লোক ছিল, তাদের চিনি না। তারা আমার দিকে ভুত দেখার মতো, হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। মাকে শান্ত করার জন্যে, আমি বললাম,
‘আমি একদম ঠিক আছি, মাকিচ্ছু হয়নি। ফোন করতে পারিনি এখানে নেটওয়ার্ক ছিল না। কিন্তু এত সকালে তোমরা কী করে এলে, আর এলেই বা কেন? বসো, বসো এই ঘরে একটা বিছানা আছে, এ ঘরে এসে বসো।’
মাকে ঘরে এনে বিছানায় বসালাম, বাবাও এলেন ঘরের ভেতর। সেই লোকদুজন দরজাতেই দাঁড়িয়ে থাকল, ঢুকল না। আমি বাবাকে জিগ্যেস করলাম,
‘বাবা, ওঁনারা কে?’ বাবা বললেন,
‘ইয়ে মানে, ওঁনারা ওই সামনের মন্দিরতলায় মন্দিরের সামনে বসেছিলাম। আজ ভোরে আসার সময়, আমরা তোর কথা জিগ্যেস করাতে, ওঁনারা বললেন, তুই গতকাল সন্ধের আগে একটা রিকশা করে এই বাড়িতে নাকি এসেছিস। কিন্তু তারপর আর কিছু জানে না। রিকশাটা লখাই চালাচ্ছিল। এই লখাই বছর ছয়েক আগে একটা দুর্ঘটনায় ইয়ে মানে...সে এক ভয়ংকর ব্যাপার...’বাবাকে আমি কথাটা শেষ করতে দিলাম না, আমি ওই দুজনকে বললাম,
‘কাকু, আমরা সবাই ঠিক আছি। কিচ্ছু হয়নি। আমার মা-বাবাকে সাহায্য করার জন্যে অনেক থ্যাংক্স। আপনারা মন্দিরের সামনেই থাকুন। ফেরার সময় আমরা দেখা করে যাবো’
আমার কথায় লোক দুজন কোন উত্তর দিল না, বরং আমার দিকে স্থির দৃষ্টি রেখে, ভয়ে ভয়ে পিছনে হাঁটতে লাগল। সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে, এক দৌড়ে ওদের সাইকেলে গিয়ে উঠল, তারপর পিছন ফিরে একবার তাকিয়ে, একজন বলল,
‘এ ছোঁড়াটা কি ওঝা নাকি বলতো’?
‘ওঝা না হাতি। ছোঁড়াটা কাল সন্ধেতেই ভূত হয়ে গেছে! ও আমি দেখেই বুঝে গেছি’
এ কথার পরে দুজনে ঊর্ধশ্বাসে সাইকেল চালিয়ে চলে গেল, মন্দিরতলার দিকে।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, ঘরে এসে মায়ের পাশে বসলাম, বাবাকেও বললাম,
‘দাঁড়িয়ে কেন, বাবা? বসো না’বাবা বিছানায় বসে, আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তারপর আমি জিগ্যেস করলাম,
‘তোমরা কখন জানলে, সব কথা?’ মা এখন অনেকটাই শান্ত, বললেন,
‘কাল সন্ধেবেলা, পাশের বাড়ির অনিলবাবু, তোর বাবার হাতে একগাদা চিঠির গোছা দিয়ে গেলেন। বললেন, “আপনারা তো অনেকদিন আসেননি, তা প্রায় বছর আষ্টেক তো হলোই। এ কবছরে আপনাদের কিছু চিঠি এসে আমার কাছেই পড়ে রয়েছে। চিঠিগুলো তেমন জরুরি বলে আমার মনে হয়নি, তাই ফোনেও আপনাদের কিছু বলিনি। এখন যখন এসেই পড়েছেন, চিঠিগুলোও দেখে নিন”অনিলবাবু তারপরেও অনেকক্ষণ ছিলেন, অনেক কথাবার্তা হল। তোর কথাও হল, বললাম যে, আজ দুপুরে তুই এখানে এসেছিস। আগামীকাল ফিরে আসবি। তুই ফোন করিসনি বলে, উনিও খুব চিন্তা করছিলেন। অনিলবাবু বেরিয়ে যাওয়ার পর আমরা রাতের খাওয়া দাওয়া সেরে ফেললাম। তোর বাবা বসল চিঠির গোছা নিয়ে। আর আমি ঘরের জিনিষপত্র সাজাচ্ছিলাম’মা একটু থামতে বাবা বলতে শুরু করলেন,
‘অনিলবাবু ঠিকই বলেছিলেন, অধিকাংশই নানান ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ড কিংবা বিজ্ঞাপনের আবর্জনা চিঠি। এই অফার, সেই অফার, হাবিজাবি। শুধু একটা চিঠি, হলুদখামের ওপর হাতে লেখা ঠিকানা, তোর মায়ের নামে। চিঠিটা খুলেই আমার চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। এইখান থেকে কোন একজন মৃণালবাবু চিঠিটা লিখেছেন। তারিখ দুহাজার সাতের ষোলোই সেপ্টেম্বর। আমাদের ঠিকানা কোথাও থেকে যোগাড় করেছেন...’
‘কি লিখেছেন’? আমি জিগ্যেস করলাম। কিন্তু উত্তর দিলেন, বাবা নয়, দিদুয়া, তিনি বললেন,
‘অ এ ওই মুখপোড়া মৃণালের কাজ। ওইজন্যে হতভাগা, একদিন এসে এ বাড়ির ঘরেদোর, আলমারি, টেবিলের ড্রয়ার হাঁটকাচ্ছিল’আমি দিদুয়াকে দেখতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু মা-বাবা দেখতে পাচ্ছেন না, বুঝতে পারলাম। দিদুয়ার গলা শুনে দুজনেই ভয়ে কাঠ হয়ে গেছেন। আমি বললাম,
‘দিদুয়া, বলা নেই কওয়া নেই, এমন চমকে দাও কেন বলো তো?’
‘থাম তো, তুই আর বকিস না, পিকলু। তুই একটা কচি ছেলে, নাক টিপলে এখনো দুধের গন্ধ মেলে, কাল সেই সন্ধে থেকে আমাদের সঙ্গে রয়েছিস, উঠছিস, বসছিস, খাচ্ছিস, দাচ্ছিস, কোন ভয় নেই। সেখানে তোর বাবা আর আমাদের মেয়ে মুখপুড়ি অনু ভয়ে একেবারে সিঁটিয়ে গেল? তাও আবার সকালবেলা, প্রকাশ্য দিবালোকে? তা হ্যাঁরে, অনু, আমরা থাকতে তোর ছেলের কোন ক্ষতি হবে এমনটা ভাবলি কী করে তুই? আমাদের সে ক্ষমতাও নেই, আর সে সাধ্যিও নেই, তবু তার মধ্যেই কাল তোর ছেলের যত্নআত্তি করতে চেষ্টার কসুর করিনি রে, অনু। তবে একটা কথা বলব, ছেলে তোর হীরের টুকরো। একে অন্ধকার, লন্ঠনের আলো, খুব কষ্ট পেয়েছে, টিভি নেই, পাখা নেই, তবু মুখে হাসিটি সর্বদা লেগে আছে। মনে মনে সব বুঝেছে, কিন্তু আমাদের অশরীরি বলে এতটুকু ভয়ও পায়নি, কিংবা হতচ্ছেদ্দাও করেনি’
মা আর বাবা অবাক হয়ে কথা শুনছিলেন, আর মা বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন। মায়ের মুখ দেখে বুঝতে পারছিলাম, ভয়টা অনেক কেটেছে। আমি উঠে গিয়ে দিদুয়ার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালাম, বললাম,
‘মন থেকে ভয় মুছে ফেল মা, তাহলেই তুমিও দিদুয়াকে দেখতে পাবে। বাবা বোধহয় একটু একটু দেখতে পাচ্ছো, না?’ বাবা কিছু বললেন না, ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালেন। মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন, তারপর নিশ্চয়ই মাও দেখতে পেলেন দিদুয়াকে, কারণ দেখলাম, মায়ের চোখে জল। মা এবার ধরা ধরা গলায় বললেন,
‘পিসিমণি, কোথায় দিদুয়া? তোমাদের যে এভাবে দেখতে হবে ভাবিনি গো’ মা উঠে এসে দিদুয়াকে প্রণাম করতে, দিদুয়া মাকে জড়িয়েই ধরলেন, আর তারপর মা হাপুস নয়নে কাঁদতে লাগলেন। দিদুয়া কিছুক্ষণ পরে, মাকে বললেন,
‘কাঁদিস নে, মুখপুড়ি, কাঁদিস নে। চুপ কর, তোর ছেলের জন্যে তাও তো আমাদের দেখাটা হল। তোরা বোস, আমি মিনুকে বলি, তোদের জন্যে একটু চা করে দিক, আর জলখাবারের কি ব্যবস্থা করছে তাও দেখি’ মা তখনো কাঁদছিলেন, বললেন,
‘ওসব নিয়ে তোমরা ব্যস্ত হয়ো না, দিদুয়াআমরা এখনই ফিরে যাবো, পিকলুকে নিয়ে’
‘তাই বুঝি? কেমন ফিরে যাস আমি দেখছি। আমরা বুঝি খোনা সুরে কথা বলতে পারি না? হিহিহিহি করে হাসতে পারি না? তুই কী মনে করেছিস? আমরা ঘাড় মটকে রক্ত শুষে খেতে জানিনা?’
দিদুয়ার এই কথায় বাবা হাসলেন,  মাও ফিক করে হেসে ফেললেন, তারপর মা বললেন,
‘তুমি এখনো সেই আগের মতোই রয়ে গেছ, দিদুয়াএকটুও বদলাও নি’দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিদুয়া বললেন,
‘খোলসটুকুই যা গেছে রে, পোড়ারমুখি। বাকি সব তো একই। কিন্তু দুপুরে দুটি মাছের ঝোল ভাত খাইয়ে তবেই তোদের ছাড়বো। এ কথার অবাধ্য হয়ে আর জ্বালাস না, অনু’
এই সময়েই পিসদিদা দুহাতে দুটো প্লেটে দুকাপ গরম চা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলেনতাঁরও চোখ ভেজা ভেজা, তিনিও সব কথাই শুনেছেন। চায়ের কাপদুটো মা আর বাবার হাতে দিয়ে, দিদা আমাকে জিগ্যেস করলেন,
‘তোর জন্যে এক গ্লাস দুধ এনে দিই, খা’আমি খুব অবাক হলাম, বললাম,
‘কেন? আমাকে কি এতই বাচ্চা মনে হচ্ছে? আমিও সকালে চা খাই, আমাকেও চা দাও, দিদা’
‘তুই খুব ফচকে হয়েছিস, বুঝলি তো? একটুও ভিরমি না খেয়ে তিন তিনটে অশরীরির সঙ্গে কাল সারারাত আরামে কাটিয়ে দিলি, এখন আবার বলছিস চা খাবি?’ দিদা আরো বললেন, ‘বলি আমাদের কি একটুও মান্যিগণ্যি করতে নেই? এসব অলক্ষুণে আর অসৈরন ব্যাপারস্যাপার আমার ভালো ঠেকছে না বাপু। শেষে আমরা কী আবার মানুষ হয়ে যাবো নাকি?’ আমি হাসতে হাসতে বললাম,
‘ও দিদা, তা তোমার মানুষ হতে আপত্তি কিসের’? দিদা যেন চমকে উঠে বললেন,
‘রক্ষে কর বাবা, মানুষ হবার অনেক ঝক্কি। বাতের ব্যাথা, অম্বলের চোঁয়া ঢেঁকুর, মশার কামড়। সরস্বতীপুজোয় পাড়ার ছোঁড়াদের চাঁদার দৌরাত্ম্যি। সে সব থেকে মুক্তি পেয়ে দিব্যি আছি। আর মানুষ হয়ে কাজ নেই। এই বেশ আছি। ভয়ে কেউ এ বাড়ির কাছ ঘেঁসে না, বলে হানাবাড়ি। দাঁড়া, তোর চাটাও নিয়ে আসি’
এমন সময় লখাইমামা এসে ঘরে ঢুকল। বাবা জিগ্যেস করলেন,
‘এটি আবার কে?’ বাবার এই কথায় দিদুয়া উত্তর দিলেন,
‘ওই তো আমাদের পোড়ারমুখো লখাই। রিকশা চালাত, আমাদের দেখভালও করত। তারকেশ্বরে পুজো দিয়ে সেদিন আমরা মা আর মেয়েতে স্টেশন থেকে ওর রিকশাতেই ফিরছিলাম। একটা লরি এসে রিকশার পিছনে টুক করে একটু ছুঁয়ে দিল। আমরা তিনজনে তিনদিকে ছিটকে পড়লাম, আর ব্যস – মহানিম গাছের মগ ডালে পা ঝুলিয়ে বসে আমরা মজা দেখতে লাগলাম। স্টেশনের বাইরে, বড়ো রাস্তায় আমরা তিনদিকে শুয়ে আছি, আমাদের ঘিরে ধরে গুচ্ছের লোকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হা হুতোশ করছে। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ এল, অ্যাম্বুলেন্স এল। আস্তে আস্তে ভিড়ও সরে গেল। আমরা মহানিম গাছের থেকে সোজা এ বাড়ির ওই মহানিম গাছে ভেসে উঠলাম’
‘দিদুয়া, তোমাদের বাড়ির সামনের ওই বড়ো গাছটাও মহানিম, না? মহানিম গাছের সঙ্গে তোমাদের সম্পর্কটা কী বলোতো? কালকে স্টেশনে আমাকে লখাই মামা চিনল কী করে? আর চেনার পরে, তোমাদের খবরই বা দিল কী করে?’
‘আমাদের সব খবর জেনে তোর কী কাজ রে, মুখপোড়া?’
‘ও দিদুয়া বলো না, বলো না’, আমি বায়না ধরলাম খুব।
‘আচ্ছা, আচ্ছা, বলছি। বট, অশ্বত্থ, আম, জাম গাছে যেমন পাখিপুকলিদের বাস, তেমনি মহানিম গাছে আমাদের সঙ্গীসাথিদের অনেকেই বাস করে। তোর মুখে সিংহবাহিনী বাড়ি আসার কথা শুনে, লখাই তোকে চিনতে পেরেছিল, এ তুই ছাড়া আর কেউ না। লখাই ওর বন্ধু হারুর সঙ্গে আড্ডা দিতে ওই মহানিম গাছে, প্রায় রোজই যায়। হারুকে দিয়ে লখাই খবর পাঠিয়ে ছিল, আর ওই হারুই তোর জন্যে রান্নাবান্নার সব যোগাড় করে দিয়েছিল। আমাদের যাওয়া আসাতে তেমন আর সময় লাগে কোথায়? চোখের পলক ফেলার আগেই পৌঁছে যাই, এদিক সেদিক’
কথার মাঝখানেই দিদা আমার চা এনে দিল, আমি চা খেতে খেতে বললাম,
‘হুঁ, এতক্ষণে লখাইমামার ব্যাপারটা বুঝলাম। এবার বলো তো, আমার জন্যে এই যে এত খাবার দাবার বানাচ্ছো, জিনিষপত্র, মাছ, সবজি, আনাজ, তেল মশলা, কোথা থেকে আনছো? লখাইমামা, লখাইমামার বন্ধু দোকান থেকে চুরি করে আনছে নাকি’? আমার এই কথায় দিদুয়া খুব রেগে গেলেন, ডানহাত দিয়ে বাঁহাতটা খুলে নিয়ে, লাঠির মতো ধরে আমায় মারতে উদ্যত হলেন, আর আগুনের ভাঁটার মতো চোখ জ্বালিয়ে বললেন,
‘তোর আস্পদ্দা তো কম নয়? মুখপোড়া ছোঁড়া, আমাকে চোর বলছিস? তোকে আমি চুরি করে খাওয়াচ্ছি? তোর ঘাড় আমি আজ না মটকেছি তো আমার নাম শৈলবামনি নয়’দিদুয়ার এই রাগ দেখে লখাইমামা মাঝখানে দাঁড়াল, বলল,
‘ও বুড়িঠাকমা, ঠাণ্ডা হও, ঠাণ্ডা হও। আমি বলছি যা বলার। তুমি ঠাণ্ডা হয়ে বসো দেখি। পিকলুবাবু, আমাদের অশরীরিদের খাওয়াদাওয়ার কোন ঝামেলা নেই, আর কোন খরচাও নেই। তোমার দিদুয়ার কি জমানো পয়সার অভাব ছিল, মনে করছো? তুমি যে ঘরে কাল ঘুমিয়েছ, সে ঘরেই সুটকেসে এখনো অনেক নগদ টাকা রাখা আছে। মাঝে এই নোট বাতিলের সময় কদিন একটু ঝামেলা হয়েছিল। আমি বলেছিলাম, কী হবে ওই নোট বদলে? তোমার দিদুয়াই বললেন, “নারে লখাই, কখন কী কাজে লাগে কে জানে? টাকা কটা তুই গোপালবেনের মুদিখানা থেকে পালটেই নিয়ে আয়”সেই টাকা দিয়েই কাল আমার বন্ধু হারু, গোপালবেনের দোকান থেকে সব জিনিষ এনে দিয়েছে’
‘গোপালবেনে তোমাদের দেখতে পায়? কথা বলে’?
‘হে হে গোপালও তো আমাদের মতো অশরীরি। আমরা এপারে আসার কিছুদিন পরেই, পুকুরে চান করতে গিয়ে ডুবে মরল। ব্যস, পুকুরের ওপাড় থেকে, চলে এল আমাদের এ পারে। গোপালের দোকানে এখন বসে তার বড়ো ছেলে নেপাল। ছোকরার ক্যাশবাক্সে হিসেব মতো টাকা ফেলে, গোপাল আমাদের মাল এনে দেয়অসৈরণ কিছু একটা ঘটছে, সে টের পায়, তবে বেনে-ব্যবসাদার মানুষ, টাকা পেলেই হল, ও নিয়ে বেশি মাথা ঘামায় না’   



দিদুয়া আমার ওপর যা রেগে গিয়েছিলেন, বাপরে, অনেক কষ্টে সে রাগ ভাঙালাম। বললাম,
‘ও দিদুয়া, খুব খিদে পেয়েছে গো, আজকে পরোটা আর আলুভাজা খাওয়াও না’আমার এই কথাতেই কাজ হল। দিদুয়া আর পিসদিদা মিলে ময়দা মেখে পরোটা বানাতে বসলেন। আর আমরা সবাই মিলে রান্নাঘরের সামনে বসে গল্প করতে লাগলাম। অনেক কথা। সেই মায়ের ছোটবেলাকার কথা। দিদুয়ার বিয়ের আগে কলকাতায় চিড়িয়াখানা, যাদুঘর দেখতে যাওয়ার কথা। কলকাতায় তাঁর দেখা পোড়ারমুখো লালমুখো গোরা সায়েব মেমদের কথা। দিদুয়ার মুখে সেই পোড়ারমুখো লালমুখোদের কথা শুনতে শুনতে আমরা তো হেসেই সারা হয়ে গেলাম।
বেশ কাটল সারাটা দিন। দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে, আমরা গাড়িতে ওঠার আগে দিদুয়া আর দিদাকে মা আর আমি আবার প্রণাম করলাম। এবার বাবাও প্রণাম করলেন।
দিদুয়া আর দিদা দুজনেই বললেন,
‘অফিসের ছুটিছাটায় চলে আসিস। তোরা আসাতে কতদিন পরে কত কথা হল। খুব আনন্দ হল’
‘আসব, দিদুয়া, নিশ্চয়ই আসবো। কিন্তু তোমরা কলকাতায় যেতে পারবে না’?
‘আমরা কী করে যাবো বল? ইচ্ছে করলেই কী আর যাওয়া যায়? আমাদের আর সে উপায় নেই রে!’ লখাই মামা পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল, বলল,
‘তোমাদের বাড়ির কাছাকাছি, কোন মহানিম গাছ আছে কি? যদি থাকে একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি’
‘মহানিম গাছ? লক্ষ্য করিনি তো! এবার গিয়ে লক্ষ্য করবো। যদি থাকে তাহলে তোমাকে কী করে খবর দেবো?’
‘খুব সহজ। নির্জন দুপুরে গাছের নিচেয় গিয়ে, মুখ উঁচু করে বলবে, “সিংহবাহিনী বাড়ির লখাইকে একটু খবর দেবেন ভাই? বলবেন, বুড়িঠাকমার পুতি পিকলু তাকে ডাকছে”-ব্যস’


কলকাতায় আমাদের পাড়ায় কোন মহানিমগাছ নেই। তোমাদের পাড়ায় আছে কি? থাকলে একটু খবর দেবে, ভাই? খুব জরুরি একটা খবর দেওয়ার আছে দিদুয়াকে। দেখে জানাও না, প্লিজ।

-০০-